প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে দেশজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলন এবং বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের ঘটনায় ভারতের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও কথিত পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি জানতে চেয়েছেন, “শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ কে দিয়েছিল?”
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দেশব্যাপী চাপের মুখে পদত্যাগ করার একদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে রাহুল গান্ধী এই দাবি জানান। দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
চিঠিতে রাহুল গান্ধী লেখেন, “২০২৬ সালের ২০ জুলাই দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
বিরোধী দলীয় নেতার অভিযোগ, ওই দিন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নির্মম লাঠিচার্জ চালায়, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং এমনকি পেলেট গানও ব্যবহার করে। এছাড়া পেরেক বসানো লাঠি দিয়েও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলেন তিনি।
রাহুল গান্ধী বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু তাদের কথা শোনার পরিবর্তে নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে বলপ্রয়োগ করেছে, এমনকি প্রাণঘাতী অস্ত্র ও টিয়ার গ্যাসও ব্যবহার করেছে। এতে শত শত মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদেরও পুলিশ সদস্যরা নির্যাতন করেছে, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়েছে।”
চিঠিতে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগকে তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো প্রাণঘাতী পেলেট গান ব্যবহার। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে গুরুতর আহত বহু মানুষের ছবি দেখা গেছে, যার মধ্যে একজন সাংবাদিকও রয়েছেন। আমি ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাহিল লোচাবের সঙ্গে দেখা করেছি। পেলেট গানের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং একটি চোখ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।”
যদিও দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আহতদের শরীরে পেলেট গানের আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষতচিহ্নের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
২৪ জুলাই পেলেট গানে আহত ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাহিল লোচাবকে সঙ্গে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনও করেন রাহুল গান্ধী।
এদিকে একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দিল্লির কনট প্লেস এলাকার পালিকা বাজারের ওপরের অংশে অবস্থানরত এক র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) সদস্যকে নিচে থাকা এক বিক্ষোভকারীর দিকে, যিনি শেখ ইরশাদ মনসুরি নামে পরিচিত, পেলেট গান সদৃশ একটি অস্ত্র তাক করে গুলি করতে।
এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (CRPF) মহাপরিচালক জ্ঞানেন্দ্র প্রতাপ সিং জানিয়েছেন, বাহিনী তাদের অভিযানের একটি পেশাদার পর্যালোচনা করবে। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি বলেন, “আন্দোলন শেষ হয়েছে এবং জনতা ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর আমরা প্রতিটি বড় অভিযানের মতো এবারও পেশাদারভাবে ঘটনার মূল্যায়ন করব। এরপর বাহিনীর সদর দপ্তরের অবস্থান জানানো হবে।”
রাহুল গান্ধী তার চিঠিতে আরও প্রশ্ন তোলেন, “দিল্লিতে মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনী শেষ পর্যন্ত আপনার কাছেই জবাবদিহি করে। তাই জানতে চাই— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পেলেট গানসহ প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন কি আপনি দিয়েছিলেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তাহলে কে দিয়েছে? সাধারণ পোশাকে লাঠি হাতে শিক্ষার্থীদের মারধর করতে দেখা ব্যক্তিরা কি পুলিশ সদস্য, নাকি স্বেচ্ছাসেবক? তাদের মোতায়েনের অনুমতি কে দিয়েছে?”
চিঠির শেষাংশে রাহুল গান্ধী বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার। “বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংলাপের মাধ্যমে তাদের অভিযোগের সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। এ ধরনের নৃশংস সহিংসতা গণতন্ত্রের সব নীতিকে ধ্বংস করে এবং দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ— তরুণ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









