একটি মুঠোফোন। কারও কাছে যোগাযোগের মাধ্যম, কারও কাছে বিনোদন, আবার কারও কাছে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু ২০২৬ সালে প্রকাশিত একাধিক ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ছোট্ট যন্ত্রটিই কোথাও হয়ে উঠেছে হত্যার কারণ, কোথাও ছিনতাইয়ের লক্ষ্য, আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধ বা আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। একটি প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশে গড়ে প্রতি মাসে ১০ হাজারের বেশি মুঠোফোন হারানো, চুরি বা ছিনতাই হয়।
আইফোনের জন্য কিশোরকে হত্যার অভিযোগ
মার্চে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে ১৭ বছর বয়সী কলেজছাত্র সিয়াম মোল্লার মরদেহ একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, চার সহপাঠী তাকে আইফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য হত্যা করেছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিয়ামকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশ আরও জানায়, চুরি করা আইফোনটি ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয় এবং তারা হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
মুঠোফোন চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা
জুনে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে ফজরের নামাজের সময় মুসল্লিদের মুঠোফোন চুরির অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনকে একদল লোক মারধর করে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়।
আইফোন চুরির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রের সন্দেহ
সেপ্টেম্বরে মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুরে আইভী আক্তার নামে এক তরুণীকে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যার পর তার আইফোন নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, আইফোন চুরির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকেছিল এবং আইভী তাদের চিনে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
ফোন কেড়ে নেওয়ার পর আত্মহত্যা
ভারতের রাজস্থানের কোটায় আগস্টে ১৬ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ময়াঙ্ক বিষপানে মারা যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটাত এবং খেলায় মগ্ন থাকত। বাবা তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নেওয়ার পর বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে সে বিষপান করে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।
তিনজনের মৃত্যু, পরে আইফোনের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন
আগস্টে ভারতের মহারাষ্ট্রে ১৯ বছর বয়সী কুনাল চন্দগুড়ে পাহাড় থেকে পড়ে মারা যান। তাকে থামাতে গিয়ে তার বাবা-মায়েরও মৃত্যু হয়। প্রথমদিকে ঘটনাটি মুঠোফোন নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশ-উদ্ধৃত প্রতিবেদনে আসে।
তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশ জানায়, পরিবারটির মধ্যে প্রায় তিন মাস ধরে বিরোধ চলছিল এবং আইফোনকে ঘটনার কারণ হিসেবে তারা নাকচ করেছে। নিহত তরুণের এক আত্মীয়ও আইফোনের কিস্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করেন। ফলে এই তিন মৃত্যুকে আইফোনের কারণে মৃত্যু হিসেবে গণনা করা যাবে না।
কুমিল্লায় অপ্রতিমের মৃত্যু
সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয় লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকা থেকে।পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। পরে আর বাড়ি ফেরেনি। তার মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনাগুলো একটি উদ্বেগজনক বিষয় সামনে আনে—দামি স্মার্টফোন, বিশেষ করে আইফোন, এখন শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের পণ্য নয়; এর উচ্চমূল্য ও সহজে বিক্রির সুযোগ এটিকে চোর-ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতি মাসে ১০ হাজারের বেশি মুঠোফোন হারানো, চুরি বা ছিনতাই হওয়ার যে তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝায়। তবে ফোনের দাম বা ব্র্যান্ডকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যার একমাত্র কারণ বলা যাবে না। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত, ময়নাতদন্ত, পুলিশি বক্তব্য এবং আদালতের সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









