বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) স্টল বরাদ্দকে ঘিরে চলছে এক বিশাল মধ্যস্বত্বভোগী বাণিজ্য। সিটি করপোরেশনের খাতায় যাদের নাম বরাদ্দপ্রাপ্ত হিসেবে নিবন্ধিত, তাদের বড় একটি অংশই প্রকৃত ব্যবসায়ী নন। সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী, রাজনৈতিক নেতানেত্রী এবং করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ভাঙিয়ে নেওয়া এসব স্টল এখন রূপ নিয়েছে কোটি টাকার পজিশন বিক্রি ও সাবলেট ব্যবসায়।
ফলে একদিকে যেমন যুগের পর যুগ ধরে ব্যবসা করে আসা শহরের আসল ব্যবসায়ীরা দোকান না পেয়ে চড়া দামে দোকান ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে নামমাত্র রাজস্ব পেয়ে হাত কামড়াচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ।
বিসিসির নথিপত্র পর্যালোচনা ও সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর ১২টি সরকারি মার্কেটে প্রায় ১,৬৫০টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে ফজলুল হক অ্যাভিনিউ মার্কেট (২৭৫টি স্টল), সদর রোড মার্কেট, মেডিকেল মার্কেট ও মিউনিসিপ্যাল মার্কেট অন্যতম। নিয়ম অনুযায়ী, এসব স্টল থেকে বিসিসির কোষাগারে মাসে দোকানভেদে মাত্র ৫২৭ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪,৭৩০ টাকা পর্যন্ত জমা পড়ে। বছরে রাজস্ব আসে মাত্র চার কোটি টাকার মতো।
অথচ বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরাদ্দ পাওয়া নামধারী মালিকরা করপোরেশনকে ওই সামান্য ভাড়া পরিশোধ করলেও মূল ব্যবসায়ীদের কাছে স্টলগুলো সাবলেট দিয়েছেন আকাশচুম্বী মূল্যে। দোকানভেদে ২২ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত অফেরতযোগ্য অগ্রিম এবং মাসে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, করপোরেশনের জায়গা ব্যবহার করে এই মধ্যস্বত্বভোগী চক্রটি বছরে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা পকেটে পুরছে।
নগরীর প্রবীণ এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থার বয়স ৮০ বছর গড়ালেও সিটি করপোরেশনের একটা স্টল বরাদ্দের জন্য দরখাস্ত করে বারবার খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। অথচ যাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসার অভিজ্ঞতাই নেই, তারা ডজন ডজন স্টল বরাদ্দ নিয়ে আমাদেরই কাছে ২০-২৫ হাজার টাকায় সাবলেট দিচ্ছে।
২৬ বছর ধরে ভাড়া দোকানে ব্যবসা করা অপর এক বিক্রেতা জানান, বিসিসি যদি সরাসরি ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের স্টল দিত, তবে সরকারের রাজস্ব শতকোটি টাকা ছাড়াত আর আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীদেরও লাখ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে বলির পাঁঠা হতে হতো না।
আইন কী বলে, বাস্তবে কী হচ্ছে?
বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিধিমালা অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া কোনো স্টল হস্তান্তর, নাম পরিবর্তন কিংবা অন্য কারো কাছে সাবলেট দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিসিসির প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ আমিনুল ইসলাম আমিন স্পষ্টভাবে জানান, বরাদ্দ বাতিল হওয়ার মতো পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে যদি জালিয়াতি প্রমাণ করা যায়।
অন্যদিকে বিসিসির রাজস্ব কর্মকর্তা বাবুল হালদার স্বীকার করেন, পৌরসভা আমলের শর্ত অনুযায়ী ১২ মাসের অগ্রিম ভাড়া দিয়ে অনুমতি নিয়ে সাবলেটের বিধান থাকলেও বিগত ৬ বছরে কেউ সেই আইনি পথ মাড়াননি। অর্থাৎ শতভাগ সাবলেটই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
স্টল নিয়ে তৈরি হওয়া এই দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভাঙতে ইতোমধ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিসিসি প্রশাসন। বিসিসির সচিব রূম্পা সিকদার জানান, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে কিছু অবৈধ স্টলের বরাদ্দ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
বিসিসির বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দৃঢ় কণ্ঠে জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অতীতের এসব জালিয়াতি ও দুর্নীতির ফাইলপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









