যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, ফুটবল বিশ্বকাপ এবং নানা উৎসবের আবহে দেশটির মানুষের ব্যস্ত থাকারই কথা। কিন্তু উৎসবের আড়ালে মার্কিন অর্থনীতিতে জমছে উদ্বেগের মেঘ। সম্প্রতি দেশটির জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এই বিশাল ঋণ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে সতর্ক সংকেত স্পষ্ট। ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং সরকারি ঋণ পরিশোধের খরচও ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কীভাবে এত বড় ঋণ তৈরি হলো?
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল। ১৯৮১ সালে এই মাইলফলক অতিক্রম করার সময় এটিকে বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
কিন্তু এরপর কয়েক দশকে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও কম। মাত্র এক দশকের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
সরকারের ব্যয় দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি। সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির ব্যয়, বিভিন্ন করছাড় এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায় বিপুল সরকারি ব্যয়—সব মিলিয়ে ঋণ বাড়তে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হার। সুদের হার যত বাড়ে, সরকারের আগের ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের খরচও তত বাড়ে।
কতটা গুরুতর এই পরিস্থিতি?
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ প্রতিদিনই দ্রুত বাড়ছে। কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির হিসাবে, জাতীয় ঋণ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০ হাজার ডলার করে বাড়ছে। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও দ্রুত বাড়ছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক অর্থনীতিবিদ এরিক সোয়ানসনের মতে, এক দশক আগের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো সুদের হার।
দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সুদের হার বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সরকারের বিপুল ঋণ নেওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ।
সরকারকে ঋণ নিতে হলে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ ধার করতে হয়। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি বেশি ঝুঁকি দেখেন, তাহলে তারা বেশি সুদ দাবি করবেন। এতে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বাড়বে। এভাবেই একটি দুষ্টচক্র তৈরি হতে পারে।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সংকটের দিকে যাচ্ছে?
এই মুহূর্তে এমনটা বলা ঠিক হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো বেশ কিছু বড় সুবিধা রয়েছে।
দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মার্কিন ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। ফলে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বেশি ঋণ বহন করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এ এল-এলিয়ান পরিস্থিতিটিকে ‘হলুদ সতর্ক সংকেত’ হিসেবে দেখছেন—লাল সংকেত হিসেবে নয়। অর্থাৎ এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, কিন্তু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ১২৬ শতাংশ। জাপান ও ইতালির মতো কয়েকটি জি-৭ দেশের তুলনায় এই হার কম।
তবে বড় ঝুঁকি হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া। যদি তারা মার্কিন সরকারি বন্ড কিনতে ক্রমেই বেশি সুদ দাবি করেন, তাহলে সরকারের ঋণ পরিশোধের খরচ আরও বাড়বে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সাবেক অধ্যাপক চার্লি বিনের মতে, এমন একটি পর্যায় হয়তো আসতে পারে যখন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মার্কিন বন্ড বিক্রি করতে শুরু করবেন। তবে সেই সীমাটি কোথায়, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন না।
সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব কী?
জাতীয় ঋণের বিষয়টি অনেকের কাছে দূরের কোনো সরকারি হিসাব মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে।
সরকারের ঋণের খরচ বাড়লে সামগ্রিকভাবে সুদের হারও বেশি থাকতে পারে। এর ফলে বাড়ির ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদ বাড়তে পারে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে তারা সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ সরকারি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত মানুষের পারিবারিক বাজেটেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মার্কিন সরকারি বন্ডকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের কারণে যদি দেশটির সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকে, তার প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। অন্যান্য দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও বেশি সুদে ঋণ নিতে হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ এল-এলিয়ানের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে যা ঘটে, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
সামনে কী হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ধীর হলেও এখনো প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে। এটি দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
অর্থনীতি বাড়লে সরকারের কর আদায় বাড়ে। ফলে সরকারি ব্যয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধ করা তুলনামূলক সহজ হয়। পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলে ঋণের বোঝাও সামলানো সম্ভব।
কিন্তু প্রবৃদ্ধি যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে করব্যবস্থায় সংস্কার, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতি।
ঋণ পুনর্গঠনের মতো আরও কঠিন পদক্ষেপের কথাও তাত্ত্বিকভাবে বলা হচ্ছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
মার্কিন ট্রেজারি ইতিমধ্যে সরকারি বন্ডের চাহিদা বাড়ানো এবং ঋণের সুদ কমানোর লক্ষ্যে বন্ড পুনঃক্রয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এর সুফল স্থায়ী হয়নি; অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার আবার বেড়েছে।
রাজনৈতিক সমাধান কতটা সম্ভব?
সমস্যার অর্থনৈতিক সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক সমাধান হয়তো আরও কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণ মানুষের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য বড় রাজনৈতিক ইস্যু।
সরকার যদি ঋণ কমাতে চায়, তাহলে হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু দুটিই ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ফলে আগামী দুই-তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণ শুধু একটি বড় সংখ্যা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সামনে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা একটি চ্যালেঞ্জ। এখনো দেশটির অর্থনীতি শক্তিশালী, ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান অটুট এবং সংকট মোকাবিলার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।
তবে ঋণ যদি বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকে এবং সুদের খরচও বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এখনই হয়তো লাল সংকেত জ্বলেনি। কিন্তু হলুদ সংকেত স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র সেই সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, নাকি সংকট আরও গভীর হওয়ার অপেক্ষা করবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









