নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দূরদূরান্তের ভাটি এলাকাগুলো থেকে। বহু লাশের ভিড়ে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মর্গে আর ঠাঁই খালি নেই বলে জানিয়েছে নেপালি সংবাদমাধ্যম। ভয়াবহ এ বন্যায় এখনো নিখোঁজ রয়েছে প্রায় ২০০০ জনের বেশি মানুষ।
এদিকে নেপালের রসুয়া এলাকার ভোতেকোশি নদীতে আবারও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটি অঞ্চলের জন্য সতর্কতা জারি করেছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ)।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।
পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে সেই পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
বন্যার প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। নদীর স্রোতে মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল বন্যাকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছায়।
দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলো থেকে উদ্ধার লাশের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। উজানে হিমবাহ ধসে প্লাবন ডাকা ভোতেকোশি নদীতে ভেসে আসা মৃতদেহগুলো ভাটির অনেক দূর পর্যন্ত উদ্ধার করা হচ্ছে। এমনকি কিছু লাশ ভারতের দিকেও ভেসে এসেছে।
কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, রসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে আসা মরদেহ ভাটির চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপরাসি, গোর্খাসহ অন্যান্য জেলায় পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বেশ কয়েকটি এলাকার হাসপাতালের মর্গগুলোতে এখন লাশ রাখার ন্যূনতম জায়গা খালি নেই। খুব বেশি দিন লাশ সংরক্ষণ করে রাখার পরিষেবাও নেই সেখানে।
এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিতওয়ানে উদ্ধারকৃত মরদেহের সংখ্যা সেখানকার হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা স্থানীয় হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিতওয়ানের ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মর্গ গড়ে তুলছে প্রশাসন। ভরতপুর মহানগরীর বিদ্যুৎ রোডের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’–এর একটি পরিত্যক্ত ভবনকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গত বৃহস্পতিবার চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও) গণেশ আরিয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চিতওয়ান অঞ্চলের ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত অংশ থেকেই ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সিডিও গণেশ আরিয়াল জানান, চিতওয়ানের সব কটি হাসপাতালের মর্গ মিলিয়ে বড়জোর ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ একসঙ্গে রাখা সম্ভব। সেই ধারণক্ষমতার ওপর ইতিমধ্যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হওয়ায় নতুন এই অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি লাশ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যদি এই ধারণক্ষমতাও পেরিয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
ভরতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ এই অস্থায়ী ভবনটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছে। লাশগুলো যাতে পচে না যায়, সে জন্য ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বসানো হচ্ছে এবং ড্রাই আইস ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিতওয়ানের বিভিন্ন শিল্প ও বণিক সমিতি এই জরুরি ড্রাই আইস সরবরাহের খরচ ও দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছে।
ভোতে কোশিতে ফের পানি বৃদ্ধি, সতর্কতা জারি: নেপালের রসুয়া অঞ্চলের ভোতে কোশি নদীতে আবারও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটি অঞ্চলের জন্য সতর্কতা জারি করেছে এনডিআরআরএমএ।
সংস্থাটির বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়, বুধবারের হড়পা বানে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ বয়ে আনা নদীটির পানির স্তর বেড়ে যাওয়ায় ফের বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে।
৯৩ হাজার মানুষের জরুরি ত্রাণের প্রয়োজন: শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, হিমালয় অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে রেড ক্রস।
সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা এবং চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জিরোং কাউন্টি।
সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় এক সংবাদ সম্মেলনে নেপালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের প্রতিনিধি প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, “আমরা মনে করি নেপালে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের জরুরি সহায়তার চরম প্রয়োজন।”
স্বজনদের ফিরে আসার প্রার্থনা: কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে লোকনাথ চৌলাগাইন তার ২৩ বছর বয়সী ভাগ্নে সুদর্শনকে খুঁজছিলেন।
লোকনাথ আল জাজিরাকে জানান, বাস চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করা সুদর্শন বুধবার হড়পা বানের সময় তিব্বত সীমান্তবর্তী শহর তিমুরের চেকপয়েন্টে অপেক্ষা করছিলেন। বন্যা আঘাত হানার পর স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৫৪ মিনিটে তার নম্বরে একটি ফোন আসে, কিন্তু সুদর্শন ফোনটি ধরেননি। তারপর থেকে তাকে ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারটি বন্যা কবলিত এলাকার কাছাকাছি এবং এখন কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে সুদর্শনকে খুঁজছে।
শুধু সুদর্শন নয়, এমন আরও শত শত মানুষের খোঁজে হাসপাতালগুলোতে ভিড় করেছে বহু পরিবার। তারা আশা করছেন, অলৌকিকভাবে হলেও হয়ত তারা ফিরে আসবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









