সবুজ বন আর আঁকাবাঁকা নদীতে ঘেরা নেপালের চিতওয়ান জেলা রূপকথার মতোই সুন্দর। যে জনপদ কদিন আগেও মুখরিত ছিল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায়, প্রলয়ংকরী বন্যা আর হড়পা বানে তা এখন নিমিষেই রূপ নিয়েছে ধ্বংসস্তূপে। গত বুধবারের সেই তাণ্ডবে জেলাটির চোখজুড়ানো সৌন্দর্য ঢাকা পড়েছে স্বজনহারা মানুষের কান্না আর ধ্বংসস্তূপের নিচে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, একসময়কার নয়নাভিরাম চিতওয়ানের পাহাড়ের নিচের সমতল যেন এখন কয়েক দিন আগের ঢলে ভেসে আসা শত শত অজ্ঞাত মরদেহের গণকবরের পরিণত হয়েছে। এখনও প্রতিনিয়ত উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাত লাশ।
গত বুধবারের বন্যা ও ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চিতওয়ানের রসুয়া অঞ্চলের প্লাবিত উপত্যকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে সমতল ভূমিতে অবস্থিত দেবঘাট বনে শত শত কবর খুঁড়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব কবরে অজ্ঞাত ও বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশ দাফন করা হচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও এ বনের পথগুলো ভোরে পরর্যটকদের প্রাতঃভ্রমণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। সেই জনপ্রিয় জায়গাগুলো এখন দ্রুত পচতে শুরু করা লাশের অস্থায়ী কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চিতওয়ানের ভারতপুরের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও) গণেশ আর্যাল রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়েই এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। অজ্ঞাত লাশগুলোকে দ্রুত পচন ধরার কারণে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। সেটা নিয়েই আমাদের মূল দুশ্চিন্তা ছিল।”
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ান জেলা কর্তৃপক্ষ শনিবার একদিনেই বনাঞ্চলে অন্তত ৯৬টি অজ্ঞাত লাশ দাফন করেছে। রোববার আরও শতাধিক লাশ দাফন করা হচ্ছে।
মৃতদের তথ্য সংগ্রহ করতে, অবশিষ্টাংশের ছবি তুলতে, স্বজনদের সনাক্তকরণে সহায়তা করতে এবং দাফনের জন্য মরদেহ প্রস্তুত করতে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তা কাজ করছেন। তারপরও প্রতিনিয়ত নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে বহু মানুষ ভিড় করছেন। তাদের আকুল কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
কর্তৃপক্ষ বলছে, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা প্রতিটি কবরের স্থান যত্ন সহকারে নথিভুক্ত করা হয়েছে। মাটির উপরে এবং নিচে উভয় স্থানেই সনাক্তকরণ চিহ্ন এবং সুনির্দিষ্ট অবস্থানের ডেটা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া নেপালি কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত মৃতদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে, যাতে পরবর্তীতে পরিবারের দাবি, সরকারি রেকর্ড বা জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের পরিচয় পাওয়া গেলে দেহাবশেষ খুঁজে বের করে উত্তোলন করা সম্ভব হয়।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে গত বুধবার আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৫০০ এর বেশি মানুষ। তাদের সন্ধানে রোববার পঞ্চম দিনের মত উদ্ধার অভিযান চালায় উদ্ধারকারীরা। অন্যদিকে তিব্বতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ৫৪৬ জন।
এদিকে ভারতীয় এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালে গত বুধবার ঘণ্টায় অন্তত ৩০০ কিলোমিটার গতিতে বন্যা আছড়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে যেকোনো ধরনের পাথর ধসের ঘটনা ঘটলে, তা তিনটি হ্রদের ওপর আবার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি এড়ানোর একমাত্র উপায়, নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু এখনো তেমন কিছু করা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









