জার্মানির সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ার পর ক্ষমতায় যেতে রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের সমর্থন চেয়েছে কট্টর ডানপন্থি দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)।
রোববারের নির্বাচনে এএফডি ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সরকারি ফল অনুযায়ী, ৮৩ আসনের রাজ্য আইনসভায় দলটি পেয়েছে ৩৯টি আসন। ফলে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি তারা। এখন ক্ষমতায় যেতে কয়েকজন রক্ষণশীল আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে দলটি।
অভিবাসনবিরোধী এবং রাশিয়াপন্থি অবস্থানের জন্য পরিচিত এএফডি অভিবাসীদের বহিষ্কার, ইউক্রেনকে জার্মানির সামরিক সহায়তা বন্ধ এবং ইউরো মুদ্রা থেকে জার্মানির বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে।
এই ফল প্রধানমন্ত্রী ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জনপ্রিয়তার সংকটও স্পষ্ট করেছে। মের্ৎসের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে মাত্র ১৭.২ শতাংশ ভোট। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় তাদের ভোট প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। প্রায় ৮৩ হাজার সাবেক সিডিইউ ভোটার এবার এএফডিকে ভোট দিয়েছেন।
‘ফায়ারওয়াল’ নীতি নিয়ে চাপ
এএফডির জয় জার্মানির মূলধারার দলগুলোর দীর্ঘদিনের একটি নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সিডিইউসহ প্রধান দলগুলো এতদিন এএফডির সঙ্গে সরকার গঠন বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা থেকে বিরত থেকেছে। এই নীতিকে জার্মান রাজনীতিতে ‘ফায়ারওয়াল’ বলা হয়।
এএফডি এই নীতিকে গণতন্ত্রবিরোধী বলে দাবি করে। দলটির জাতীয় সহ-নেতা টিনো ক্রুপালা সিডিইউ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, রাজনীতিতে সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনের ফল থেকে সিডিইউকে শিক্ষা নিতে হবে এবং ‘দলীয় হিসাব-নিকাশের রাজনীতি’ পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে।
এএফডির রাজ্য প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ড বলেন, আইনসভায় স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা সম্ভব হলে তিনি সাক্সনি-আনহাল্টের মুখ্যমন্ত্রী হতে চান। এ জন্য তিনি বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান।
জার্মানির মূলধারার দলগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু পপুলিস্ট বামপন্থি দল বিএসডব্লিউ এএফডির সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। দলটির নেত্রী সাহরা ওয়াগেনকনেখট বলেন, এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে নতুন করে ‘ফায়ারওয়াল’ গড়ার চেষ্টা করা হলে তা ভোটারদের প্রতি অবমাননা হবে।
বিএসডব্লিউও ব্যাপক অভিবাসনের বিরোধিতা করে এবং ইউক্রেনকে জার্মানির সহায়তা বন্ধ ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পক্ষে। দলটি আইনসভায় ভোটদানে বিরত থাকলে এএফডি নেতা জিগমুন্ডের সংখ্যালঘু সরকার গঠনের পথ খুলে যেতে পারে। তবে জিগমুন্ড আগে এমন সরকারের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন।
ইউরোপে উদ্বেগ
এএফডির জয় জার্মানির প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ ফলাফলকে ‘খুবই উদ্বেগজনক সংকেত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া পপুলিস্ট রাজনীতির ঢেউ ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কিও ফলাফলকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এএফডিকে ‘চরমপন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং দলটির ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। এএফডি অবশ্য এই তকমা প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ দিকে দলের জাতীয় সহ-নেতা অ্যালিস ভাইডেল এই ফলকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে এএফডি অন্তত ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
এএফডির উত্থান ইউরোপের অর্থনীতি ও ইউরোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। দলটি জার্মানিকে ইউরো মুদ্রা থেকে বের করে আনার পক্ষে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে কট্টর ডানপন্থিদের এই উত্থান দীর্ঘমেয়াদে একক মুদ্রার স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









