এল নিনো আবহাওয়াজনিত কারণে সৃষ্ট খরার প্রভাবে পানামা খাল দিয়ে প্রতিদিন চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা আরও কমানো হতে পারে। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাল পার হওয়ার সুযোগ পেতে নিলামে লাখ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে কোনো কোনো জাহাজকে। এর মধ্যে আবহওয়ার চক্র বদলে যাওয়ায় আবার চাপে পড়েছে জাহাজ চলাচল।
প্রকৃতির চক্রে এখন এল নিনোর সময়। এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালের পানি কমছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আবারও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে—এমন আশঙ্কা করছে জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট শিল্প। খবর রয়টার্সের
এল নিনোর প্রভাবে পানামায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দেশটিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এই আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে।
চলতি বছরের এল নিনো গত চার দশকের রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, পানামা খালে জাহাজ চলাচল কমানোর সিদ্ধান্ত এসেছে এমন সময়ে, যখন এই খালের ব্যবহার বেড়েছে। কারণ ইরানের অবরোধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবসায়ীরা পানামা খাল ব্যবহার করছেন।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পরিচালিত হয় আন্তঃমহাসাগরীয় পানামা খাল দিয়ে। ইতোমধ্যেই প্রতিদিন সর্বোচ্চ জাহাজ চলাচলের সংখ্যা গত মাসের ৩৬টি থেকে কমিয়ে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ৩২টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা দুটি জলাধারের পানি ব্যবহার করেই পানামা খাল পরিচালিত হয়। এল নিনোর প্রভাবে খরা শুরু হওয়ায় এসব জলাধারের পানির স্তর কমে গেছে।
পর্যাপ্ত পানি না থাকলে খালের শুরু ও শেষ প্রান্তে থাকা লক ব্যবস্থা দিয়ে জাহাজকে ওপরে তোলা ও নিচে নামানোর কাজ করা সম্ভব হয় না।
সোমবার পানামা খাল কর্তৃপক্ষের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়া ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা এএফপিকে জানান, খরা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি বা মার্চে আমাদের দৈনিক জাহাজ চলাচলের সীমা আরও কমাতে হতে পারে— সম্ভবত ২৪টিতে নামবে না, তবে ২৯টি বা এর কাছাকাছি হতে পারে।’
প্রতি জাহাজে ২০ কোটি লিটার পানি-
প্রতিটি জাহাজকে খাল পার করাতে প্রায় ২০ কোটি লিটার পানি প্রয়োজন হয়। পরে সেই পানি সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালে এল নিনোর কারণে জলাধারগুলোর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে প্রতিদিন জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ৩৮টি থেকে কমিয়ে ২২টিতে নামানো হয়েছিল।
তবে পানামা খাল কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম নারী এসপিনো দে মারোত্তা বলেছেন, এবার পরিস্থিতি ২০২৩ সালের পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে তিনি মনে করেন না।
জাহাজের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ খালে চলাচলকারী জাহাজের সর্বোচ্চ ড্রাফট বা পানির নিচে জাহাজের গভীরতাও কমিয়েছে। এটি ১৫ দশমিক ২ মিটার থেকে কমিয়ে ১৪ দশমিক ৬ মিটার করা হয়েছে।
ড্রাফট বলতে পানির উপরিভাগ থেকে জাহাজের তলদেশের সবচেয়ে নিচের অংশ পর্যন্ত উল্লম্ব দূরত্বকে বোঝায়। নিরাপদে ভাসতে ও তলদেশে আটকে না যেতে একটি জাহাজের কতটা পানির গভীরতা প্রয়োজন, তা বোঝাতে এই পরিমাপ ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে পানামা খালে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে এবং পণ্য সরবরাহে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পানামা খালের প্রধান ব্যবহারকারী। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল ও চীনের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে দ্রুততম রুট।
যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশ এই খাল দিয়ে যায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে পানামা খালে জাহাজ চলাচল আরও বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায়, জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে পানামা খাল এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









