বিশ্বের সব শিশুর জন্য শিক্ষার দরজা খোলার লক্ষ্য বহুদিনের। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ এখনো দীর্ঘ। ইউনেস্কোর ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) রিপোর্ট’ বলছে, শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে হলে শুধু স্কুলের সংখ্যা বাড়ানো বা নতুন নীতি গ্রহণ করলেই হবে না; প্রয়োজন ‘সমতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি’।
২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনটি ‘কাউন্টডাউন টু ২০৩০’ সিরিজের প্রথম অংশ। পরবর্তী দুই প্রতিবেদনে যথাক্রমে শিক্ষার মান ও শেখা এবং শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
২৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু এখনো স্কুলের বাইরে
রিপোর্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিশ্বে এখনো প্রায় ‘২৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু, কিশোর ও তরুণ শিক্ষার বাইরে’। ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষের হার কমার গতি ধীর হয়ে গেছে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই ধীরগতি সবচেয়ে বেশি।
অর্থাৎ, বিশ্বে প্রতি ছয়জন শিশু, কিশোর ও তরুণের একজন এখনো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
তবে ছবিটির আরেকটি দিকও আছে। ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ‘৩২ কোটি ৭০ লাখ বেশি শিক্ষার্থী’ স্কুলে যাচ্ছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু সেই অগ্রগতি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যথেষ্ট দ্রুত নয়।

শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
রিপোর্ট বলছে, গত কয়েক দশকে বহু দেশ শিক্ষাকে মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও আইন গ্রহণ করেছে। ১৯৯৮ সালে মাত্র ৮ শতাংশ দেশে ১২ বছর মেয়াদি বাধ্যতামূলক শিক্ষা ছিল। ২০২৩ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ‘২৬ শতাংশ’। একই সময়ে বিনা মূল্যে শিক্ষার গড় মেয়াদ ১০ বছর থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৮ বছর হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ২০০০ সালে মাত্র ১ শতাংশ দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার আইন ছিল; এখন তা বেড়ে ‘২৪ শতাংশে’ দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা আইনে উল্লেখ করা দেশের সংখ্যাও ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে।
শুধু স্কুলে ভর্তি নয়, প্রয়োজন সমতার নিশ্চয়তা
জিইএম রিপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—‘শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে হলে অর্থায়নেও সমতা আনতে হবে।’
দরিদ্র, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারগুলো বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। স্থানীয় সরকার, স্কুল, শিক্ষার্থী ও পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার মতো ব্যবস্থার ব্যবহার গত ২৫ বছরে চার থেকে ছয় গুণ বেড়েছে। স্কুলে খাবার দেওয়ার কর্মসূচিও দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। নতুন ‘ইকুইটেবল ফাইন্যান্সিং ইন এডুকেশন (ইএফই) সূচক’ দেখাচ্ছে, ১০টি দেশের মধ্যে একটিরও কম দেশে শিক্ষা অর্থায়ন ব্যবস্থায় শক্তিশালী সমতার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

কোন দেশগুলো দ্রুত এগিয়েছে?
প্রতিবেদনটি কোনো একটি দেশকে ‘সেরা উদাহরণ’ হিসেবে তুলে ধরার বদলে জানতে চেয়েছে—কোন দেশ কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তন ধরে রাখতে পেরেছে।
২০০০ সালের পর মাদাগাস্কার ও টোগো শিশুদের স্কুলের বাইরে থাকার হার অন্তত ৮০ শতাংশ কমিয়েছে। কিশোরদের ক্ষেত্রে মরক্কো ও ভিয়েতনাম এবং তরুণদের ক্ষেত্রে জর্জিয়া ও তুরস্ক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। একই সময়ে আইভরি কোস্ট তিন বয়সগোষ্ঠীরই শিক্ষার বাইরে থাকার হার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা দেশগুলোর তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মেক্সিকো এল সালভাদরের তুলনায় শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষের হার ২০ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি কমিয়েছে। সিয়েরা লিওন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার লাইবেরিয়ার চেয়ে ২২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি বাড়িয়েছে। ইরাক মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার আলজেরিয়ার চেয়ে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি বাড়িয়েছে।
এসব পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, শিক্ষায় সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থ নয়—‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।’
দ্রুত সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা
জিইএম রিপোর্ট তাই কোনো ‘একটি সেরা নীতি’ খুঁজতে বলছে না। কারণ এক দেশে সফল কোনো ব্যবস্থা অন্য দেশে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
রিপোর্টের চারটি মূল নীতির মধ্যে রয়েছে—‘বিভিন্ন নীতির সমন্বয়, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন, স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে নীতি তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।’
শিক্ষাব্যবস্থায় একসঙ্গে প্রয়োজন সামগ্রিক সংস্কার, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং ভালো শেখার পরিবেশ। শুধু একটি পদক্ষেপ দিয়ে বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব বাস্তবতা বুঝে নীতি তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিটি দেশের নিজেদের উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্যের জন্য নিজেদের নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি করা জরুরি।

তথ্যের আড়ালে যেন বৈষম্য লুকিয়ে না থাকে
শিক্ষার অগ্রগতি বোঝার জন্য শুধু কতজন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। বয়স অনুযায়ী অংশগ্রহণ, শিক্ষা সম্পন্ন করার হার, ঝরে পড়া ও একই শ্রেণিতে বারবার থাকার বিষয়ও নজরে রাখতে হবে।
রিপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দিয়েছে: পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ‘২৭ শতাংশ প্রাক্-প্রাথমিকের বদলে সরাসরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়’। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন শেষ পর্যন্ত স্নাতক হতে পারে না।
বৈষম্যের তথ্যও অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রতি তিনটি দেশের একটি শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের ব্যবধানের তথ্য প্রকাশ করে না। প্রতি দুটি দেশের একটি সম্পদ বা পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে শিক্ষার ব্যবধানের তথ্য দেয় না।
২০৩০-এর পথে নতুন দিশা
২০২৬ সালের জিইএম রিপোর্টের বার্তা হল—‘শিক্ষায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হলে সমতাকে কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’ দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। ২০৩০ সালের শিক্ষা-লক্ষ্যের দিকে এগোতে বিশ্বের ৮০ শতাংশ দেশ ইতিমধ্যে অন্তত কিছু এসডিজি ৪ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এখন প্রয়োজন সেই লক্ষ্যগুলোকে জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা এবং বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত পরিমাপ করা।
কারণ স্কুলের দরজা খুলে দেওয়া শুধু প্রথম ধাপ। আসল প্রশ্ন হলো—‘সেই দরজা দিয়ে কি সব শিশু সমানভাবে ঢুকতে পারছে, থাকতে পারছে এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে? ২০২৬ সালের জিইএম রিপোর্ট মনে করিয়ে দেয়, এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









