খবরের পৃথিবী সব সময় সত্যের পৃথিবী নয়
কখনো একটি সংবাদ তৈরি হওয়ার আগেই তার চারপাশে দেয়াল উঠে যায়। সরকার তার ভাষা ঠিক করে দেয়। বড় ব্যবসা তার স্বার্থের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর সংবাদমাধ্যম সেই ভাষার ভেতর দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছায়। তখন সত্য কোথায় থাকে?
জন পিলজারের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘টেল মি নো লাইস’ সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যের দিকে ফিরে তাকানোর একটি চেষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে তৈরি এই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার বইটি যেন অন্ধকার ঘরে রাখা অনেকগুলো ছোট আলো।
পিলজার প্রতিটি প্রতিবেদনের আগে সেই সময়ের কথা বলেন। কেন প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছিল, কীভাবে সাংবাদিকটি সত্যের কাছে পৌঁছেছিলেন, আর সেই সত্য প্রকাশের জন্য তাকে কী মূল্য দিতে হয়েছিল—এসবও তিনি মনে করিয়ে দেন।
এই সাংবাদিকদের সবার রাজনৈতিক বিশ্বাস এক নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি জায়গায় মিল আছে। তারা সহজ উত্তর মেনে নেননি। ক্ষমতাবানদের কথাকে শেষ কথা ভাবেননি। তারা প্রশ্ন করেছেন। কখনো সেই প্রশ্নের মূল্যও দিয়েছেন।
মার্থা গেলহর্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে দাখাউ বন্দিশিবিরে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা লিখেছিলেন। উইলফ্রেড বারচেট হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমার পরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে অন্য এক সত্য দেখিয়েছিলেন। সেই সত্য ছিল যুদ্ধের বিজয়ের গল্প নয়; ছিল মানুষের শরীর, মৃত্যু আর নীরবতার গল্প।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভেতরের অন্ধকার তুলে ধরেছিলেন জেমস ক্যামেরন ও সেমুর এম. হার্শ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের সহিংসতা অনুসরণ করেছিলেন ম্যাক্স দু প্রিজ ও জ্যাক পাউ। আন্না পলিটকভস্কায়া চেচনিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা লিখেছিলেন।

আর আমিরা হাস লিখেছেন ফিলিস্তিনিদের জীবন নিয়ে—দখলদারির ছায়ার নিচে যে জীবন প্রতিদিন একটু একটু করে সংকুচিত হয়।
বইটির পাতায় বারবার ফিরে আসে একটি বিষয়: ক্ষমতা সত্যকে নিজের মতো করে বলতে চায়।
গুন্টার ভালরাফ অভিবাসী শ্রমিকের পরিচয় নিয়ে জার্মানির শ্রমজীবী মানুষের জীবন দেখেছিলেন। পল ফুট লকারবি বিস্ফোরণের পেছনের গোপন প্রশ্নগুলো অনুসরণ করেছিলেন। সিমাস মিলন ব্রিটিশ রাষ্ট্র ও গোয়েন্দা সংস্থার গোপন কর্মকাণ্ডের দিকে তাকিয়েছিলেন। ফিলিপ নাইটলি থ্যালিডোমাইড কেলেঙ্কারির পেছনে থাকা ওষুধ কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অনুসন্ধান করেছিলেন।
এই প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে দিয়ে একটি অস্বস্তিকর পৃথিবী ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়। এমন একটি পৃথিবী, যেখানে ক্ষমতাবানরা ভুল করতে পারে, অপরাধ করতে পারে, তারপরও নিজেদের গল্পটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ইরাক নিয়ে বইটির শেষ অংশটি আরও কঠিন। সেখানে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রচারণার ভেতরে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের কথা উঠে আসে। রবার্ট ফিস্কসহ কয়েকজন সাংবাদিক দেখিয়েছেন, একটি যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও তার মৃত্যু শেষ হয় না। তার ছায়া মানুষের ঘর, শরীর ও স্মৃতির মধ্যে থেকে যায়।
পিলজারের উদ্বেগ ছিল আরও গভীরে।
প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, সংবাদ পৌঁছানোর পথ যত দ্রুত হয়েছে, সাংবাদিকতা তত স্বাধীন হয়নি। বরং বড় গণমাধ্যম ক্রমেই রাষ্ট্র ও করপোরেট শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। ফলে সত্য জানা গেলেও সেটি মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু পিলজার পুরোপুরি হতাশ হননি। তিনি ইন্টারনেট ও তৃণমূল সাংবাদিকতার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। ছোট, স্বাধীন কণ্ঠও যে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, সেটিই তার আশা।
‘টেল মি নো লাইস’ তাই শুধু কিছু বিখ্যাত প্রতিবেদনের সংকলন নয়। এটি সাংবাদিকতার একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়— ‘যখন সবাই একটি কথা বলছে, তখন যে মানুষটি অন্য কথাটি বলার সাহস করে, তার পাশে কে দাঁড়াবে?’
সম্ভবত সেখান থেকেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শুরু। একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়। কখনো কখনো তার কাজ হলো সেই জায়গায় দাঁড়ানো, যেখানে অন্যরা তাকাতে চায় না। মৃত মানুষের পাশে, পরাজিত মানুষের পাশে, ভুলে যাওয়া মানুষের পাশে।
সেখানে সত্য খুব উজ্জ্বল হয় না। কখনো তা কেবল একটি ক্ষীণ আলো। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেই সামান্য আলোই যথেষ্ট।

টেল মি নো লাইস — ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যান্ড ইটস ট্রায়াম্ফস, সম্পাদনা: জন পিলজার, প্রকাশক: জোনাথন কেপ , ৮৭১ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ২০ পাউন্ড।
পরিচিতি
জন পিলজার ছিলেন অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক, লেখক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। ১৯৩৯ সালে সিডনিতে তার জন্ম। সাংবাদিকতা শুরু করেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরে লন্ডনে গিয়ে ডেইলি মিরর-এ কাজ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তার সাহসী প্রতিবেদন তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মৃত্যু, রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার এবং সংবাদমাধ্যমের নীরবতা ছিল তার সাংবাদিকতার প্রধান বিষয়।
পিলজার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এবং দখলদারিত্ব নিয়ে অনুসন্ধানী কাজ করেছেন। তার প্রামাণ্যচিত্র ‘কম্বোডিয়া: ইয়ার জিরো’, ‘ডেথ অব আ নেশন: দ্য তিমোর কনস্পিরেসি’ এবং ‘দ্য ওয়ার ইউ ডোন্ট সি ’ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। একই নামে তার লেখা বইও রয়েছে। তিনি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও উইকিলিকসেরও কাজের সমর্থক ছিলেন। পিলজারের বিশ্বাস ছিল, সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতার ভাষা পুনরাবৃত্তি করা নয়, বরং তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য খুঁজে বের করা। ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর লন্ডনে ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









