দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে একসঙ্গে বসেছেন ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরানসহ জোটের প্রভাবশালী নেতারা। পশ্চিমা প্রভাব কমিয়ে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতৈক্য থাকলেও, সেই ব্যবস্থার রূপ কী হবে—তা নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট। ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য বিরোধ ও ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন সেই পার্থক্য আরও সামনে এনেছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে এই সপ্তাহান্তে বিশ্বের কয়েকটি শক্তিশালী দেশের নেতারা একটি বিশাল গোল টেবিল ঘিরে বৈঠকে বসেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে বলেন, “ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোকে শুধু অন্যদের তৈরি নিয়ম মেনে চললে হবে না; তাদের ক্রমেই বিশ্বের নিয়ম তৈরিতে ভূমিকা নিতে হবে।”
বৈঠকে ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা।
তবে এই দেশগুলোকে স্বাভাবিক মিত্র বলা কঠিন। তাদের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এমনকি সামরিক সংঘাতের ইতিহাসও রয়েছে।
২০২০ সালে ভারত ও চীনের বিতর্কিত সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল। আবার মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও বিপরীত অবস্থানে ছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও বিশ্ববাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এত ভিন্ন অবস্থানের নেতাদের এক জায়গায় বসাতে পারা ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য। সম্মেলনটি সদস্য দেশগুলোর জন্য ইরান যুদ্ধের পর নিজেদের সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি করেছে।
তবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হবে—এ বিষয়ে একমত হওয়া এবং সেই লক্ষ্যে বাস্তব ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক কঠিন। দিল্লির এই সম্মেলনে সেই সীমাবদ্ধতাই বারবার সামনে এসেছে।

পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প হতে চায় ব্রিকস
চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো সদস্যদের কাছে ব্রিকস এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব কমানো সম্ভব।
তবে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখতে চায় না। সম্মেলনে মোদিও স্পষ্ট করে বলেছেন, “এই জোট কারও বিরুদ্ধে নয়।”
ভারতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দিল্লি একই সঙ্গে পরস্পরের বিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়েত বলেন, “ব্রিকসের কিছু সদস্য এটিকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করতে চাইলেও ভারত সেই পথে হাঁটছে না। বরং যুদ্ধের সময়ে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোই ভারতের লক্ষ্য।”
যৌথ ঘোষণায় যা বলা হলো, যা বলা হলো না
সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ যখন এতটাই স্পষ্ট, তখন দিল্লি সম্মেলনে একটি যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করতে পারা ব্রিকসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
এর আগে চলতি বছর দুবার ব্রিকসের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। এবার ঐকমত্য হয়েছে। তবে তা সম্ভব হয়েছে মূলত যেসব বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে গিয়ে।
সম্মেলনের প্রথম দিনেই ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ বা দিল্লি ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ঘোষণায় কী নেই, সেটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
ফিলিস্তিনের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোর করে উচ্ছেদ এবং দখলদারিত্বকে দীর্ঘায়িত বা বৈধতা দিতে পারে—এমন পদক্ষেপেরও বিরোধিতা করা হয়েছে।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। ব্রিকসের আগের কয়েকটি ঘোষণার তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে। ঘোষণায় ‘বৈষম্যমূলকভাবে বাড়তে থাকা শুল্ক’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোনথির মতে, কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিন্দা করা ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, “শুল্ক নিয়ে ঘোষণায় তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থাকাও কিছুটা বিস্ময়কর। সম্ভবত ভারত এই সুযোগে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে চেয়েছে।”

সম্মেলনের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় অনেক ব্রিকস সদস্যের কাছেই বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
তবে সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল—এমন কিছু বৈঠকের সুযোগ তৈরি হওয়া, যা কয়েক মাস আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিচিত সরাসরি বৈঠক।
ইরানের জন্য এই সম্মেলন ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে একা নয়—এমন বার্তা দেওয়ার সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা তেহরান ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দিয়েছে।
মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে ইরান।
ভারত-চীন সম্পর্কেও নতুন বার্তা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর পর তিনি ভারতে এলেন।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যও চীনের পক্ষে অনেক বেশি। দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে এই বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দিল্লিতে মোদি ও শির মধ্যে করমর্দন হয়েছে। তবে মোদির বহুল পরিচিত আলিঙ্গন দেখা যায়নি। শিও ২৪ ঘণ্টারও কম সময় ভারতে ছিলেন এবং শনিবার রাতে মোদির দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেননি।
তারপরও দুই নেতার বৈঠক ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, তারা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
অনিল ত্রিগুণায়েতের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-চীন সম্পর্ক ধীরে ধীরে কিছুটা উষ্ণ হচ্ছে এবং দুই পক্ষের মধ্যেই একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। তবে এর ফলে বাস্তবে কতটা অগ্রগতি হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তার ভাষায়, “আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, তবে তার আগে যাচাইও করতে হবে।”
সামনে কী?
দিল্লি সম্মেলন দেখিয়েছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস এমন একটি জায়গা তৈরি করতে পারে, যেখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ পায়।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগের পর কী হবে?
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে—বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু সেই নতুন ব্যবস্থা ঠিক কেমন হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়।
ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং ভারত-চীন সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো ব্রিকসকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একই সঙ্গে এগুলো জোটটির ভেতরের মতপার্থক্যও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ফলে ব্রিকস এখন একদিকে যেমন নতুন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তার সদস্যদের স্বার্থ ও কৌশলের পার্থক্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









