এক হাজার বছর আগে জাপানের রাজদরবারে এক নারী বসে লিখছিলেন মানুষের মন নিয়ে। প্রেম ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল, ঈর্ষা ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, ক্ষমতার খেলা ছিল। ছিল এমন কিছু অনুভূতি, যার বয়স আসলে কোনো শতাব্দী মানে না। সেই লেখাই পরে হয়ে ওঠে ‘দ্য টেল অব জেনজি’—বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম উপন্যাস হিসেবে যাকে সবচেয়ে বেশি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
লেখক মুরাসাকি শিকিবু। তিনি লিখেছিলেন আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে, জাপানের হেইয়ান যুগে। তখন পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই সাহিত্য মানে ছিল মহাকাব্য, ধর্মীয় আখ্যান কিংবা রাজা-রাজড়ার বীরত্বের গল্প। কিন্তু মুরাসাকি লিখলেন অন্য রকম কিছু। তাঁর গল্পের কেন্দ্র যুদ্ধ নয়, কোনো রাজ্যের উত্থান-পতনও নয়। কেন্দ্র একজন মানুষ—তার ভেতরের অস্থিরতা, প্রেম, ভুল, আকাঙ্ক্ষা এবং একাকিত্ব।
এটাই ‘দ্য টেল অব গেইনজি’ আজও এত আধুনিক।
এক রাজপুত্রের গল্প
গল্পের কেন্দ্র হিকারু গেইনজি। জাপানি ভাষায় ‘হিকারু’ অর্থ আলো বা দীপ্তি। তিনি সম্রাটের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ সৌন্দর্য, বুদ্ধি ও প্রতিভার অধিকারী। সংগীত, কবিতা, বিদ্যা—সবকিছুতেই তার দক্ষতা। রাজদরবারে তিনি আকর্ষণের কেন্দ্র।
কিন্তু রাজপরিবারে জন্মালেই যে সিংহাসন নিশ্চিত, তা নয়।
গেইনজির মা ছিলেন সম্রাটের প্রিয় এক নারী, কিন্তু তিনি রাজপরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাবান বংশের ছিলেন না। ফলে গেইনজিকে উত্তরাধিকারী না করে তার বাবা তাকে রাজপরিবারের বাইরে সাধারণ অভিজাতের মর্যাদা দেন। তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মিনামোতো’ বংশের পরিচয়।
এরপর শুরু হয় গেইনজির দীর্ঘ জীবনযাত্রা—প্রেম, রাজনীতি, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে।
গেইনজি বহু নারীর প্রেমে পড়েন। তাদের কেউ রাজপরিবারের, কেউ অপেক্ষাকৃত সাধারণ পরিবারের। কারও সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়, কারও সঙ্গে হয় ক্ষণিকের। কিন্তু মুরাসাকির লেখায় এসব সম্পর্ক কেবল প্রেমের গল্প হয়ে থাকে না। প্রতিটি সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের ভেতরের অনিশ্চয়তা। এই কারণেই গেইনজি শুধু একজন প্রেমিক নন। তিনি এক জটিল মানুষ।
গল্পের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মন
‘দ্য টেল অব গেইনজি’–র সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সম্ভবত এর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। প্রায় এক হাজার বছর আগে লেখা হয়েও বইটির চরিত্ররা এমনভাবে অনুভব করে, যেন তারা আমাদেরই সময়ের মানুষ।
কেউ ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর ভয়ও পায়। কেউ ঈর্ষা করে, কিন্তু নিজের ঈর্ষাকে স্বীকার করতে পারে না। কেউ সামাজিক মর্যাদার কারণে নিজের ইচ্ছাকে চাপা দেয়। আবার কেউ ভালোবাসার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। মুরাসাকি মানুষের মনের এই সূক্ষ্ম ওঠানামাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। তার গল্পে বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও চরিত্রের ভেতরে অনেক কিছু ঘটে যায়।
এখানেই ‘দ্য টেল অব গেইনজি’ অন্য অনেক প্রাচীন সাহিত্যকর্ম থেকে আলাদা। এটি কেবল কী ঘটল, সেই গল্প নয়; বরং মানুষ কোনো ঘটনার মধ্যে দিয়ে কী অনুভব করল, সেই গল্পও।
৫৪ অধ্যায়ের দীর্ঘ যাত্রা
বইটি মোট ৫৪টি অধ্যায়ে বিস্তৃত। ইংরেজিতে প্রকাশিত একটি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ পৃষ্ঠা। কাহিনি এক প্রজন্মে থেমে যায় না। গেইনজির জীবন পেরিয়ে গল্প পৌঁছে যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও। এতে আছে অসংখ্য চরিত্র। তাদের অনেকেই নারী। রাজপরিবার থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত নিচু সামাজিক অবস্থানের মানুষ—সবাই এই জগতের অংশ।
আর আছে কবিতা।
জাপানি অভিজাত সমাজে কবিতা ছিল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সরাসরি যা বলা যায় না, তা বলা হতো কবিতায়। তাই ‘দ্য টেল অব গেইনজি’–তে ছোট ছোট প্রায় ৮০০ কবিতা ছড়িয়ে আছে। প্রেমের ইঙ্গিত, অভিমান, অপেক্ষা কিংবা বিচ্ছেদের অনুভূতি—অনেক কথাই চরিত্ররা কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করে। ফলে উপন্যাসটি কখনো গদ্য, কখনো কবিতার মতো হয়ে ওঠে। যেন রাজদরবারের নীরব কোনো রাতে দূর থেকে ভেসে আসছে সংগীত।
লেখক মুরাসাকি শিকিবু কে?
মুরাসাকি শিকিবু নামটিও বেশ রহস্যময়। এটি সম্ভবত তার প্রকৃত নাম ছিল না। সে সময় জাপানের অভিজাত সমাজে নারীদের অনেক সময় তাদের পুরুষ আত্মীয়ের পদবি বা সামাজিক পরিচয়ের সূত্রে ডাকা হতো। ‘শিকিবু’ শব্দটি সম্ভবত তার বাবার রাজদরবারের একটি পদ—‘সেরিমোনিয়ালস’ বা আচার-অনুষ্ঠানবিষয়ক দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ‘মুরাসাকি’ নামটি এসেছে ‘গেইনজি’–র একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রের নাম থেকে। মুরাসাকি আবার এমন একটি উদ্ভিদের নাম, যেখান থেকে বেগুনি রং পাওয়া যায়। অর্থাৎ লেখকের নামটিও যেন তার নিজের গল্পের মতোই কিছুটা রহস্যময়।
মুরাসাকি হেইয়ান রাজদরবারে অপেক্ষাকৃত উচ্চপদস্থ এক নারীর সেবায় ছিলেন। ফলে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন রাজদরবারের জীবন—তার সৌন্দর্য, শিষ্টাচার, প্রতিযোগিতা, প্রেম, ঈর্ষা এবং ক্ষমতার অদৃশ্য লড়াই। সেই অভিজ্ঞতাই তার লেখাকে এত জীবন্ত করে তুলেছিল বলে মনে করা হয়।
‘নারীর লেখা’ বলে অবহেলা
মুরাসাকির সময়ে জাপানে চীনা ভাষা ছিল শিক্ষিত পুরুষদের জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে জাপানি লিপির একটি রূপ—কানা—নারীদের লেখার সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল। একে কখনো কখনো ‘নারীর হাত’ বলেও অবজ্ঞা করা হতো। কিন্তু সেই ‘নারীর হাতেই’ লেখা হলো এমন একটি বই, যা এক হাজার বছর পরও বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।
‘দ্য টেল অব গেইনজি’–র সঠিক রচনাকাল নিয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই। কেউ মনে করেন, এটি প্রায় ১০০৮ সালের দিকে সম্পূর্ণ হয়েছিল। কেউ আবার সময়টাকে ১০১০ সালের কাছাকাছি রাখেন। তারিখ নিয়ে এই অনিশ্চয়তা অবশ্য বইটির গুরুত্ব কমায়নি। বরং সময় যত পেরিয়েছে, মুরাসাকির গল্প তত দূরের নয়, আরও কাছের হয়ে উঠেছে।
এক হাজার বছর পরও যে গল্প আমাদের
একজন মানুষ ভালোবাসে। আবার সেই ভালোবাসা হারায়। ক্ষমতা পেতে চায়, কিন্তু ক্ষমতার মূল্যও দিতে হয়। সুন্দর জীবন চায়, অথচ জীবনের অনিবার্য ক্ষয় থেকে পালাতে পারে না।
এই অনুভূতিগুলোর কি কোনো বয়স আছে? সম্ভবত নেই।
তাই এক হাজার বছর আগের জাপানের রাজদরবারের গল্প পড়তে গিয়ে আজকের পাঠক নিজের জীবনকেও দেখতে পারেন। সম্পর্কের ভেতরের নীরবতা, না-বলা কথা, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ—সবই পরিচিত মনে হয়। হয়তো এ কারণেই ‘দ্য টেল অব গেইনজি’ শুধু বিশ্বের প্রাচীনতম উপন্যাসগুলোর একটি নয়। এটি মানুষের মনকে নিয়ে লেখা এমন এক দীর্ঘ আয়না, যেখানে এক হাজার বছর পরও আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পাই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









