বিশ্বের সংকটগুলো আলাদা কোনো ঘটনা নয়। যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে ক্ষমতার ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের শুরুতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বের বিভাজনের রেখাগুলো ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ছোট ছোট ফাটল যেন এখন বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সংকটগুলো মূলত ক্ষমতার পরিবর্তিত চিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।’’
গুতেরেস ক্ষমতার তিনটি বড় পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন-
প্রথমত, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবের নতুন নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে শক্তিশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির হাতে।
তৃতীয়ত, মানুষের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু ক্ষমতা চলে যাচ্ছে যন্ত্রের কাছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের মতে, বিশ্বের বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এমন এক সময়ের ক্ষমতার বাস্তবতা ও স্বার্থকে প্রতিফলিত করছে, যে সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে বিভক্ত হওয়ার বদলে পারস্পরিক নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক আইন ও অভিন্ন নিয়মের ভিত্তিতে একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
গুতেরেস বলেন, বড় শক্তিগুলোকেও বুঝতে হবে যে তাদের ক্ষমতা যতটা মনে করা হয়, বাস্তবে তা ততটা সর্বময় নয়। সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি একা আজকের বিশ্বের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে না।’’
তিনি বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি বড় পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন—যুদ্ধ ও শান্তি, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে গুতেরেস বলেন, ‘‘এসব সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী ঘটে। তখন শক্তি কূটনীতিকে ছাড়িয়ে যায় এবং জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।’’
তার ভাষায়, ‘‘অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত যুদ্ধবিরতিও প্রকৃত শান্তি আনছে না; বরং তা কেবল আগুন কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত মূল্য দিতে হচ্ছে।’’
গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের আদেশ মেনে চলার আহ্বানও পুণর্ব্যক্ত করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। একই সঙ্গে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কারণে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানকে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস বলেন, ‘‘একবিংশ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকা ‘অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য’।’’ বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বৈষম্যকে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখেন না গুতেরেস। তার মতে, এটি ক্ষমতারও একটি প্রশ্ন—কে সুযোগ পাবে, কে সম্পদ পাবে এবং কে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তার সঙ্গে বৈষম্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বে বিপুল সম্পদ তৈরি হলেও এখনো কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত—এই বাস্তবতার কথাও তিনি তার বক্তব্যে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের চাপ কমাতে দ্রুত ঋণ সহায়তা, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশেষ উত্তোলন অধিকার ব্যবস্থায় ন্যায্য প্রবেশাধিকারের আহ্বান জানান জাতিসংঘের মহাসচিব।
নারীর সমতার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, ‘‘জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, সদর দপ্তরের কর্মী এবং পেশাদার পর্যায়ে পূর্ণ লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে। তার বক্তব্য, ‘সমতা কোনো স্বপ্ন নয়; এটি একটি সিদ্ধান্ত।’’
জলবায়ু সংকটকে তিনি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে গভীর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা হিসেবে উল্লেখ করেন। ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অতিক্রমের আশঙ্কার কথা জানিয়ে উন্নত দেশগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু দূষণের জন্য দায়ীদের মূল্য পরিশোধের কথাও বলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়ে মহাসচিব বলেন, ‘‘তথ্য, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও অ্যালগরিদমের ওপর ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুত হচ্ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা ততটা দ্রুত বাড়ছে না।’’
গুতেরেসের বলেন, ‘‘বিপদ প্রযুক্তি নয়; বিপদ হলো জবাবদিহিতাহীন প্রযুক্তি।’’ তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বহুপক্ষীয় কাঠামো ও স্বাধীন তদারকির আহ্বান জানান। জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনিআরও বলেন, ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে জাতিসংঘ সনদের তিন মূল ভিত্তি—শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার। গুতেরেস বলেন, ‘‘মর্যাদা, সুযোগ ও অধিকার থেকে শান্তিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ক্ষমতা যাতে নীতির কাছে জবাবদিহি করে, সে জন্যই জাতিসংঘের প্রয়োজন।’’
জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, সমন্বিত ও মানুষের প্রয়োজনের সময় আরও বেশি উপস্থিত করার লক্ষ্যে ‘ভবিষ্যতের জন্য চুক্তি’ এবং জাতিসংঘের ৮০তম বর্ষের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
মহাসচিব হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হতে আর প্রায় ১০০ দিন বাকি। তবে দায়িত্বের শেষ সময় পর্যন্ত জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। শান্তি সম্ভব—এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে কাজ করে যাওয়ার কথা জানান আন্তোনিও গুতেরেস।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের শেষভাগে ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—ক্ষমতার আসল শক্তি অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা, যেখানে সবার জন্য জায়গা থাকবে। বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি হতে জাতিসংঘকে দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









