যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন বাড়ছে। সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা, বাণিজ্য ও শুল্কনীতি এবং অভিবাসন—বিভিন্ন ইস্যুতে নয়াদিল্লি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্যে নিজের অসন্তোষ জানাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অনিশ্চিত ও লেনদেননির্ভর নীতির কারণেই ভারতের এই পরিবর্তিত অবস্থান।
নিউইয়র্কে চলতি সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিষয়ে বেশ খোলামেলা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা এবং এমন কিছু ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতি নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন, যার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বেশি পড়ছে।
ভারতের এই প্রকাশ্য সমালোচনা দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এত দিন পর্দার আড়ালেই চলত মতবিরোধ
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে ভারত সাধারণত তা প্রকাশ্যে না এনে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও ছিল দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তৃত সমর্থন।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে উত্তেজনা বাড়ায় নয়াদিল্লি এখন আরও স্পষ্ট ও প্রকাশ্য অবস্থান নিচ্ছে। এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দেশের ভেতরে চাপের মুখে রয়েছেন। বিরোধীরা বারবার অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে ভারত সরকার নতি স্বীকার করছে।
বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মোদি। পরে তিনি এই কথোপকথনকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে কয়েক বছর আগে ট্রাম্পকে যে উষ্ণতায় ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, এবার তার সঙ্গে এই ভাষার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ি বলেন, জয়শঙ্করের মন্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি ‘খোলামেলা মূল্যায়ন’।
তার মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে শুরুতে ভারত যে আশাবাদ দেখিয়েছিল, এখন সেই আশাবাদের অনেকটাই ম্লান হয়েছে।
বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বড় বিরোধ
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা এখন বাণিজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশ যেন এতটা ‘আত্মকেন্দ্রিক’ না হয় যে শুধু নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং অন্য দেশের ওপর তার কী প্রভাব পড়ছে, তা গুরুত্ব দেবে না।
তিনি ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তৈরি অর্থনৈতিক চাপের কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মৌলিক প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ‘সাধারণ বোধবুদ্ধি’ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত দুই দেশ একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা নিয়ে এগোলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
কৃষি খাত এই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়। ভারতের কৃষকদের সুরক্ষার জন্য দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কৃষিপণ্য আমদানির বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে দ্রুত বাজার খুলে দেওয়ার প্রত্যাশা করছে, ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল বলে জয়শঙ্কর উল্লেখ করেন।
তবে তিনি বলেন, বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।
এ দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিও ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপের উদ্যোগ বাতিল করার পর তার প্রশাসন নতুন করে বিভিন্ন শুল্ক ব্যবস্থার দিকে যায়। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্ক এবং রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ।
জয়শঙ্করের মতে, এসব পদক্ষেপ গত বছর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের পথে ‘বাধা’ তৈরি করেছে।
তার আশা, একটি বাণিজ্য চুক্তি হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ নিয়ে ভারত এখন বেশি প্রকাশ্যে কথা বলছে, কারণ দেশটির ভেতরে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ওয়াশিংটন ভারতকে চাপ দিচ্ছে এবং ভারত এত দিন নীরব থেকেছে।
তিনি বলেন, ভারতের ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের নেওয়া পদক্ষেপগুলোও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে।

‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে ভারতের ক্ষোভ
বাণিজ্যের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ নিয়েও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে।
গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাত হয়। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর এই সংঘাত শুরু হয়েছিল।
ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প দাবি করেন, তার হস্তক্ষেপেই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধ না করলে দুই দেশই অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে—এমন হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
কাশ্মীর ইস্যুকে ভারত বরাবরই ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে দেখে। তাই এতে তৃতীয় কোনো দেশের মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপ নয়াদিল্লি সহজভাবে নেয় না।
এরপরও ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, তিনিই ওই যুদ্ধবিরতি করিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও তিনি এমন দাবি করেন। বিষয়টি ভারতকে অসন্তুষ্ট করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন। এমনকি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতও করা হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কের উন্নতি নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সন্ত্রাসবাদ।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশের কাছ থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে ভারত। কিন্তু ভারতের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি যথেষ্ট বোঝাপড়া, উপলব্ধি ও সহানুভূতি না দেখায়, তাহলে তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।
তার মতে, ভারতের প্রধান উদ্বেগগুলো যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পুরোপুরি বোঝা হচ্ছে না।
সাবেক কূটনীতিক বিসারিয়ার মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকেই ভারত প্রকাশ্যে কথা বলার শিক্ষা পেয়েছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্তও মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তানকেন্দ্রিক নীতি ভারতের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় নয়াদিল্লি এখন নিজের অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।
দেশের ভেতরেও বাড়ছে চাপ
ভারতীয়দের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এমন কাজে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ দেয় এই ভিসা।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই কর্মসূচির ওপর নানা বিধিনিষেধ ও খরচ বাড়িয়েছে। একই সময়ে তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা এমএজিএ সমর্থকদের একটি অংশও এই কর্মসূচির সমালোচনা করে আসছে।
জয়শঙ্কর বলেন, একসময় মানুষের চলাচল ও বিদেশে কাজের সুযোগকে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হতো। এখন অন্তত কিছু ক্ষেত্রে মানুষের চলাচলের অর্থনীতি এবং এ নিয়ে রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
ভারতে বিষয়টি জনমতেও প্রভাব ফেলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষক বিসারিয়ার মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও এখন সরকারের অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। আগামী বছর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে ভারত সরকার নতি স্বীকার করছে—এমন ধারণা তৈরি হওয়া নয়াদিল্লির জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে।
হর্ষ পান্ত বলেন, অভিবাসন ও যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগের মতো বিষয়গুলো ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একসময় এসব বিষয় যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতীয়দের কাছে আকর্ষণীয় অংশীদার করে তুলেছিল। এখন একই বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তার মতে, ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে মনোভাব পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং সরকার এখন সেই অসন্তোষকে প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের মেয়াদ পার হওয়ার অপেক্ষা?
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারতের কৌশলগত মহলের অনেকেই ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল বেশ উষ্ণ।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কে নানা মতবিরোধ সামনে আসে।
তারপরও চ্যাথাম হাউসের গবেষক বাজপেয়ির মতে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি।
তিনি বলেন, জয়শঙ্করের বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে ভারতকে এককভাবে লক্ষ্য করা হচ্ছে—এমনটা নয়। বরং ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেননির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির সামগ্রিক প্রভাব ভারত-মার্কিন সম্পর্কেও পড়ছে।
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি হলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হর্ষ পান্তের ভাষায়, এখন নয়াদিল্লির সামনে মূল প্রশ্ন হলো—ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো যায়।
তার মতে, শুধু ভারত নয়, বিশ্বের অনেক দেশই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে গিয়ে একই ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









