সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তটি খুব ছোট। একটি নাম উচ্চারিত হয়। সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। একজন লেখক রাতারাতি বিশ্বের পাঠকের কাছে নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই নামের পেছনে যে প্রক্রিয়া, তা মোটেই ছোট নয়। বরং দীর্ঘ, ধীর এবং গোপন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) স্টকহোমে সুইডিশ একাডেমির নতুন স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করবেন। তখন মনে হবে, সিদ্ধান্তটি যেন এইমাত্র নেওয়া হলো। আসলে তা নয়। সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে।
সাহিত্যে নোবেল দেয় সুইডিশ একাডেমি। এর সদস্য ১৮ জন—লেখক, অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী। আগের বছরের সেপ্টেম্বরে একাডেমির নোবেল কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক শ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে মনোনয়ন চায়। তাদের মধ্যে থাকেন সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক, আগের নোবেলজয়ী এবং লেখক সংগঠনের প্রধানেরা।
প্রতি বছর প্রায় ২০০ লেখকের নাম আসতে পারে। কমিটি চাইলে আগের বছর মনোনীত লেখকদের নামও আবার বিবেচনা করতে পারে। অর্থাৎ নোবেল নির্বাচন কোনো এক বছরের সাহিত্য নিয়ে বিচার নয়। এটি স্মৃতি ও ধারাবাহিকতারও একটি প্রক্রিয়া।
বসন্তে সেই দীর্ঘ তালিকা ছোট হয়ে আসে পাঁচজনে। এরপর শুরু হয় একাডেমির সদস্যদের পাঠ ও আলোচনা। গ্রীষ্মজুড়ে তারা মনোনীত লেখকদের কাজ পড়েন। কোন লেখক কী লিখেছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে—কেন এই সাহিত্য এখন গুরুত্বপূর্ণ? তার প্রভাব কত দূর? নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরে তার কোনো অর্থ তৈরি হয় কি?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। আলফ্রেড নোবেল তার উইলে পুরস্কার দেওয়ার কথা বলেছিলেন ‘আদর্শবাদী দিক থেকে সবচেয়ে অসাধারণ’ সাহিত্যকর্মের জন্য। কিন্তু ‘অসাধারণ’ বলতে কী বোঝায়, তা তিনি নির্দিষ্ট করে যাননি। ফলে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সাহিত্যিক বিচার কখনোই কেবল সাহিত্যিক বিচার হয়ে থাকেনি।
ফরাসি গবেষক জিসেল সাপিরোর মতে, একাডেমি সাধারণত এমন সাহিত্যকে গুরুত্ব দেয়, যা প্রভাবশালী, উচ্চাভিলাষী এবং নতুন কোনো সাহিত্যিক পথ তৈরি করেছে। কিন্তু একটি কাজকে একই সঙ্গে সার্বজনীনও হতে হয়। অর্থাৎ, সেটি যে সংস্কৃতি থেকে এসেছে, তার সীমানা পেরিয়ে অন্য মানুষের কাছেও অর্থ তৈরি করতে হবে।
এখানে অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাপিরোর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর নোবেল পাওয়া প্রায় সব লেখকের বই ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিলেন ২০২১ সালের নোবেলজয়ী আবদুররাজাক গুরনাহ; পুরস্কার পাওয়ার আগে তার লেখা জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়নি।
এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্যও আছে। কোনো সাহিত্যকে ‘বিশ্বসাহিত্য’ হিসেবে দেখা হবে কি না, তা শুধু তার সাহিত্যমানের ওপর নির্ভর করে না। কোন ভাষায় সেটি অনূদিত হয়েছে, কোথায় পড়া হয়েছে, কোন সাহিত্যিক পুরস্কার পেয়েছে—এসবও তার আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা তৈরি করে। সাহিত্য যেমন লেখা হয়, তেমনি তার চারপাশে তৈরি হয় একটি ব্যবস্থা।
অন্য বড় পুরস্কার তাই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারন্যাশনাল বুকার, সার্ভান্তেস বা বিখনার পুরস্কার পাওয়া একজন লেখকের নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়াতে পারে। কারণ এসব পুরস্কার শুধু সম্মান নয়; এগুলো একজন লেখকের আন্তর্জাতিক পাঠক ও পরিচিতির পরিধিরও সংকেত।
তবে সাহিত্যের কোনো একটি রূপ নোবেলের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতা ও নাটকও পুরস্কৃত হয়েছে। ২০১৬ সালে বব ডিলান নোবেল পান তাঁর গানের কথার জন্য। অর্থাৎ সাহিত্যকে কী বলা হবে, সেই সীমাটিও স্থির নয়।
রাজনীতির প্রশ্নও এড়ানো যায় না। ২০১৫ সালে বেলারুশের লেখক সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ নোবেল পান। তিনি ছিলেন দেশটির কর্তৃত্ববাদী শাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর প্রকাশ্য সমালোচক। একজন লেখকের সাহিত্য ও তার রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা সম্ভব কি না, নোবেলের ইতিহাস বারবার সেই প্রশ্ন তোলে।
আরেকটি প্রশ্ন আরও পুরোনো, কার সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্য বলা হয়?
১২২ জন নোবেলজয়ীর মধ্যে ইউরোপের বাইরের লেখক মাত্র ৩৩ জন। নারী লেখকদের উপস্থিতিও দীর্ঘদিন ছিল খুব কম। মোট বিজয়ীর মাত্র ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও পুরুষ বিজয়ীদের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য দেখা গেলেও ইতিহাসের ভারসাম্যহীনতা এত সহজে মুছে যায় না।
নোবেল কমিটির গোপনীয়তা এই প্রশ্নগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কে মনোনীত হলেন, কে শেষ পাঁচজনে ছিলেন, কার নাম শেষ মুহূর্তে বাদ গেল—এসব আমরা জানতে পারি ৫০ বছর পর। একজন লেখক নোবেলের জন্য বহুবার মনোনীত হতে পারেন, কিন্তু সেই ইতিহাস তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় অদৃশ্যই থাকে। জোহানেস ভি. ইয়েনসেন প্রথম মনোনয়নের ৪০ বছর পর ১৯৪৪ সালে নোবেল পান। ডরিস লেসিং অপেক্ষা করেছিলেন ৩৫ বছর। থমাস মানের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল ২৭ বছর।
তাই নোবেল সাহিত্য পুরস্কারকে শুধু ‘সেরা লেখক’-এর পুরস্কার হিসেবে দেখা সহজ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। এখানে সাহিত্য আছে, অবশ্যই। তার সঙ্গে আছে অনুবাদ, ভাষা, আন্তর্জাতিক পাঠক, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের জটিল সম্পর্ক। শেষ পর্যন্ত নোবেল একজন লেখকের হাতে একটি পদক তুলে দেয়। কিন্তু সেই পদকের মূল্য তৈরি হয় অনেক আগে—পাঠের টেবিলে, অনুবাদকের কাজে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায়, সাহিত্য পুরস্কারের মঞ্চে এবং কখনো কখনো রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতায়।
বৃহস্পতিবার যখন একটি নাম ঘোষণা হবে, তখন সেটি হবে একটি দীর্ঘ অদৃশ্য প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান শেষ মুহূর্ত। আর সেই প্রক্রিয়ার পুরো গল্প জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও ৫০ বছর।
নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬ সম্ভাব্যদের তালিকায় আছেন চীনা লেখক কান শুয়ে। আলোচনায় আছেন মার্গারেট অ্যাটউড ও সালমান রুশদিও। তবে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে পুরস্কার, তা জানতে আমাদের আর মাত্র ঘন্টা তিনই অপেক্ষা করতে হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









