২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ বইটি অ্যান কারসনকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন কাব্যগুরু—একজন এমন লেখক, যার মৌলিকতা অনুসরণ করার নয়, আবিষ্কার করার বিষয়। তার লেখায় প্রাচীন ও আধুনিক পাশাপাশি থাকে, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি মিশে যায় না। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও নাট্যকার। ১৯৫০ সালে কানাডার অন্টারিওতে জন্ম নেওয়া কারসন জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন ক্লাসিকসের অধ্যাপক হিসেবে। তার লেখা জায়গা পেয়েছে পেঙ্গুইন মডার্ন পোয়েটস সিরিজে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার নতুন বই ‘ফ্লোট’। নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের সাথে কথা বলেছেন দ্য অবজারভার-এর ফিচার লেখক কেট কেলাওয়ে। কথোপোকথনটি প্রায় নয় বছর আগের। গার্ডিয়ান।
প্রশ্ন: আপনার নতুন বইটি বেশ অপ্রচলিত ধরনের। বইটি নিয়ে কিছু বলবেন?
অ্যান কারসন: ‘ফ্লোট’ একটি স্বচ্ছ বাক্সে রাখা ২২টি ছোট বইয়ের সমষ্টি। এগুলো পড়তে হবে ‘শাফল’ করে—যেকোনো ক্রমে। বেশির ভাগ লেখাই প্রথমে মঞ্চের জন্য তৈরি হয়েছিল। আলাদাভাবে লেখা ও পরিবেশিত হয়েছে, অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে মিলেও। তাই পুরো বইটিকে আমি কোনো জৈবিক, একক সত্তা হিসেবে ভাবিনি। এটি নিছক একটি সংগ্রহ। নির্দিষ্ট কোনো ক্রমে পড়ার জন্য প্রকাশিত নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দৃশ্যগত বা ভাবগতভাবে একটানা প্রবাহ তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য নয়—আমার আগের বইগুলোর মতো এটা নয়।
প্রতিটি লেখারই কোনো না কোনো অংশ আমার ভালো লাগে। আবার এমন কিছু লেখাও আছে, যার প্রায় পুরোটাই আমার ভালো লাগে।
প্রশ্ন: আপনার কাজ কবিতার ধারণাটাকেই যেন প্রসারিত করে। কবিতা কী—নিজের কোনো সংজ্ঞা আছে?
অ্যান কারসন: গদ্য যদি একটি বাড়ি হয়, কবিতা হলো সেই বাড়ির ভেতর দিয়ে দ্রুত ছুটে যাওয়া এক জ্বলন্ত মানুষ।
প্রশ্ন: কবিরা কি কবি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, নাকি কবিতা তাদের বেছে নেয়?
অ্যান কারসন: আমি ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করতাম। কিন্তু তাতে খুব একটা ভালো ছিলাম না। ছবির নিচে শিরোনাম দিতে দিতে একসময় লেখার দিকে চলে এলাম। তবে ছবি আঁকার সঙ্গে লেখার সম্পর্ক খুব বেশি নয়। তারা একে অন্যকে সতেজ করে। মনের দুটি আলাদা পথ।
প্রশ্ন: আপনি কোথায় বড় হয়েছেন? আপনার বাবা-মা কী করতেন?
অ্যান কারসন: অন্টারিওর নানা ছোট শহরে বড় হয়েছি। বাবা ব্যাংকে কাজ করতেন। মা বাড়িতে থাকতেন।
প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি কী?
অ্যান কারসন: আমার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি আসলে একটি স্বপ্নের। তখন আমার বয়স তিন বা চার। আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, সেখানেই স্বপ্নটি দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখি, বাড়ির ওপরের একটি ঘরে আমি ঘুমিয়ে আছি। তারপর ঘুম ভেঙে নিচে নেমে বসার ঘরে দাঁড়ালাম। ঘরে আলো জ্বলছিল। কিন্তু চারপাশ নিস্তব্ধ, ফাঁকা। চেনা ফ্যাকাশে সবুজ দেয়ালের পাশে সেই চেনা গাঢ় সবুজ সোফা ও চেয়ারগুলো রাখা। সবকিছু আগের মতোই। ঘরটি আমি ভালো করে চিনি। কোনো কিছুই জায়গা বদলায়নি। তবু ঘরটি সম্পূর্ণ আলাদা। তার স্বাভাবিক চেহারার ভেতরেই যেন ঘরটি এমন বদলে গেছে, যেন পাগল হয়ে গেছে।
প্রশ্ন: শুনে মনে হচ্ছে, এটি অনির্ভরযোগ্যতার একটি স্বপ্ন। একজন ক্লাসিকসের অধ্যাপকের জীবন কি কবির জীবনের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য?
অ্যান কারসন: এ নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি—নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে।
প্রশ্ন: লন্ডন রিভিউ অব বুকস-এ স্টিফেন বার্ট আপনার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি কোথাও স্বচ্ছন্দ নন—নিজের মাথার ভেতরেও না, আমাদের সময়েও না, প্রাচীন জগতেও না।’ কথাটি কি সত্যি?
অ্যান কারসন: আমি পানির নিচে নিজেকে পুরোপুরি ঘরের মানুষ মনে করি।
প্রশ্ন: ছোটবেলায় আপনি অস্কার ওয়াইল্ডের ভক্ত ছিলেন। এখনো কি আছেন?
অ্যান কারসন: সম্প্রতি অন্যদের সঙ্গে মিলে আর্টঅ্যাঙ্গেলের একটি প্রকল্প শেষ করেছি। সেখানে রিডিং কারাগারে অস্কার ওয়াইল্ডের সময়কে স্মরণ করে কারাগারে থাকা একজন মানুষের লেখা একটি চিঠি লিখতে হয়েছিল।
প্রশ্ন: স্মৃতিচারণ বা কাউকে স্মরণ করার জন্য কবিতা কতটা উপযুক্ত?
অ্যান কারসন: শিল্পকে আমি থেরাপি বলে বিশ্বাস করি না।
প্রশ্ন: আপনি বক্সিং পছন্দ করতেন। কেন?
অ্যান কারসন: সাময়িক একটা পর্যায় ছিল। সেটা কেটে গেছে।
প্রশ্ন: আপনি ও আপনার স্বামী সহযোগিতামূলক কাজ শেখান। কিন্তু সহযোগিতা কি শেখানো যায়?
অ্যান কারসন: না। শুধু সেটা করা যায়। আমরা শিক্ষার্থীদের এমন কিছু কাজ দিই, যা তাদের একসঙ্গে করতে হয়।
প্রশ্ন: শুনেছি, আপনি বহুদিন ধরে আগ্নেয়গিরির প্রতি মুগ্ধ। সেটা কীভাবে শুরু?
অ্যান কারসন: যখন ছবি আঁকতাম, তখন। আগ্নেয়গিরি আঁকা খুব সহজ।
প্রশ্ন: আপনি কি সচেতনভাবে এমন কোনো আবেগী বিষয় খুঁজে বেড়ান, যা নিয়ে কবিতা লেখা যায়? আর এমন বিষয় একদিন ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কি আছে?
অ্যান কারসন: ‘সচেতনভাবে’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, নিশ্চিত নই। কারণ অন্তর্দৃষ্টি হয়তো আমাদের জানার সবচেয়ে গভীর পদ্ধতি। আর বিষয় ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলছেন—এটা আমি কী করে জানব? আমি কি এ ব্যাপারে ‘জানতে’ পারা মানুষের মধ্যে শেষজন নই?
প্রশ্ন: আপনার ‘শর্ট টক অন মোনা লিসা’ কবিতাটি আমার ভালো লাগে। মোনা লিসা কি এখনো আপনার কাছে এক রহস্য?
অ্যান কারসন: আমি কখনোই মোনা লিসাকে পছন্দ করিনি। এখনো করি না।
প্রশ্ন: আপনার উত্তরগুলো শুনে মনে হচ্ছে, আপনি সংক্ষিপ্ততাকে খুব মূল্য দেন। এটা কি সত্যি?
অ্যান কারসন: ‘শর্ট টক অন ব্রেভিটি’—সংক্ষিপ্ততা নিয়ে ছোট্ট কথোপকথন। যত দ্রুত সম্ভব চামড়া ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন—যেমন অ্যালকোহল মাখলে তা দ্রুত উধাও হয়ে যায়। একটি উদাহরণ দিই। এমিলি টেনিসনের দাদির বিয়ের দিনের সম্পূর্ণ ডায়েরি—২০ মে ১৭৬৫: ‘অ্যান্টিগনি শেষ করলাম, বিশপকে বিয়ে করলাম।’
এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত জীবনী আর কী হতে পারে? আর হয়তো এটাই সংক্ষিপ্ততার সবচেয়ে ভালো সংজ্ঞা—জীবনকে ব্যাখ্যা না করে, তার কয়েকটি শব্দ রেখে চলে যাওয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









