জর্জিয়ার পিয়ানোবাদক খাতিয়া বুনিয়াতিশভিলির সংগীতপ্রতিভা তার মা খুব ছোটবেলাতেই বুঝতে পেরেছিলেন। সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল মায়ের। ছয় বছর বয়সেই অর্কেস্ট্রার সঙ্গে একক শিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন খাতিয়া। চার বছর পর তাকে সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইতালি, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে বাজানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তার বাজনায় আবেগের গভীরতা আছে, আছে বিস্ময়কর কারিগরি দক্ষতা। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চোখে পড়ে মঞ্চে তার উপস্থিতি—যেন শরীরের ভেতর দিয়ে সংগীতকে বাইরে নিয়ে আসছেন তিনি।
খাতিয়া বুনিয়াতিশভিলির খুব কম সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। এর মধ্যে সঙ্গিত ও আর্ট বিষয়ক পোর্টাল ক্লাসিকপয়েন্ট-এর পক্ষে তার সাথে কথা বলেন ফ্লরিনা সার্চার। দৈনিক এদিন-এর পক্ষ থেকে আমরা তার এই কথপোকথনটি পাঠকের জন্য তুলে রাখলাম।
মাত্র ছয় বছর বয়সে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে একক শিল্পী হিসেবে আপনার অভিষেক হয়েছিল। সেই সময়টার কথা কীভাবে মনে পড়ে?
আমার সেই সময়ের কথা খুব ভালো মনে আছে। সময়টা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি অনেক অনুশীলন করতাম, অনেক পড়তাম। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল খুব কম।
অনেকে মনে করতে পারেন, একটি শিশুর জন্য এমন জীবন হয়তো কঠিন। কিন্তু আমার কাছে তা কঠিন ছিল না। বরং মনে হতো, আমি যেন কোনো বিশেষ, জাদুময় জায়গার মধ্যে আছি।
এখনো সেই সময়ের বইগুলোর কথা মনে পড়ে। তাদের গন্ধ মনে পড়ে। শিট মিউজিকের পাতার গন্ধও। কিছু স্মৃতি খুব ছোট—প্রায় ছুঁয়ে দেখার মতো। অথচ তারা থেকে যায়।
ওলেগ মাইসেনবার্গ আপনাকে ভিয়েনায় গিয়ে তার কাছে পড়তে রাজি করিয়েছিলেন। জীবনের সেই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখেন?
সময়টা খুব আবেগঘন ছিল। আমার কাছে সেটাই ছিল একজন মানুষ ও শিল্পী হিসেবে স্বাধীন জীবনের শুরু।
হঠাৎ অনেক নতুন কিছু আমার সামনে খুলে গেল—নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জায়গা। এসব শুধু আমাকে একজন মানুষ হিসেবে বদলায়নি, আমার বাজানোর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।
আমি সেই পরিবর্তনের জন্য কৃতজ্ঞ। এটি আমাকে ভেতর থেকে সমৃদ্ধ করেছে।
মঞ্চে আপনার শারীরিক উপস্থিতি খুবই তীব্র। কনসার্টের সময় শরীরের ভেতরে কী অনুভব করেন?
মঞ্চে আমি নিজের মতো থাকার চেষ্টা করি। পিয়ানোর সঙ্গে শরীরের সরাসরি যোগাযোগ খুব সীমিত। শেষ পর্যন্ত আঙুলের ডগা দিয়েই যন্ত্রটিকে ছুঁতে হয়।
তাই মনে হয়, শরীরের সমস্ত শক্তি সেখানে গিয়ে জমা হচ্ছে। আঙুলের ডগা দিয়ে সেই শক্তি শব্দে চলে যায়। অনুভূতিও তখন শব্দের মধ্যে প্রবেশ করে।
সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে মুক্ত মনে করি। আবার মনে হয়, আমি একা নই। আমি কোনো একটি সম্পূর্ণতার অংশ।
নিজের পিয়ানো সঙ্গে নিয়ে বাজানো কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, নাকি আয়োজকদের দেওয়া যন্ত্রও ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ?
আমি বরং নতুন যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালোবাসি। প্রতিটি পিয়ানোরই আমার কাছে আলাদা একটি আত্মা আছে।
আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করি। প্রথম দেখাতেই তাকে বিচার করতে চাই না। যদি আগে থেকেই মনে করি, এই যন্ত্র ভালো নয়, তাহলে সম্পর্কটা আর তৈরি হবে না।
তাই আমি নিজেকে খোলা রাখি। দেখি, যন্ত্রটি আমাকে কী বলতে চায়।

আপনার শোপাঁর সিডিতে নিজের লেখা, ছবি এবং আপনাকে নিয়ে তৈরি একটি চলচ্চিত্রও যুক্ত করেছিলেন। সংগীতকে শুধু নিজের ভাষায় কথা বলতে দিলেন না কেন?
আমি যখন সংগীত বাজাই—মঞ্চে বা স্টুডিওতে—সংগীত নিজেই কথা বলে। সে আবেগকে এক জায়গায় আনে, গল্প বলে।
আমি মানুষের কল্পনাশক্তিকে ভালোবাসি। সংগীত আমাকে কল্পনা করতে সাহায্য করে। সাহিত্যও আমার জীবনের খুব গভীর একটি অংশ।
আট বছর বয়সে আমি চেখভের সব গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। দশ বছর বয়সে দস্তয়েভস্কির দ্য গ্যাম্বলার ও দ্য ইডিয়ট খুব আনন্দ নিয়ে পড়েছি।
সাহিত্য ও সংগীত—এই দুটিই আমার জীবনের অনুভূতি। তাই তাদের আলাদা করে রাখতে পারি না। সব সময় মনে হয়েছে, তাদের একসঙ্গে আনা দরকার।
আমার মাথায় কোনো ভাবনা এলে সেটি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তা আমাকে শান্তি দেয় না।
একটি সিডিকে আমি শুধু সিডি হিসেবে দেখি না। এটি যেন একটি অ্যালবাম—আবেগে ভরা। একটি ছবি যেন শব্দের দিকে নিয়ে যায়। একটি শব্দ যেন আবার সংগীতের দিকে। আর সংগীত থেকে ফিরে আসা যায় ছবিতে।
সবকিছু যেন একে অন্যের মধ্যে প্রবেশ করে।
আপনার ‘মাদারল্যান্ড’ সিডিটি মাকে উৎসর্গ করেছিলেন। বুকলেটে আপনাদের দুজনের অনেক ছবি রয়েছে। মায়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?
আমাদের সম্পর্ক খুব গভীর।
আমি তার উপস্থিতি খুব তীব্রভাবে অনুভব করি। তিনি সংবেদনশীল, ভালোবাসায় পূর্ণ একজন মানুষ।
হয়তো সে কারণেই সিডিটি তাঁকে উৎসর্গ করতে চেয়েছি। কিছু মানুষ আমাদের জীবনের ভেতরে এত গভীরভাবে থেকে যান যে তাঁদের আলাদা করে ভাবা যায় না।
একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে কখনো কি একাকিত্ব অনুভব করেন?
হ্যাঁ।
তবে ছোটবেলা থেকেই একা থাকতে অভ্যস্ত আমি। একা থাকার মধ্যে কখনো কখনো স্বাধীনতা আসে। নিজের ভেতরের জায়গাটুকু তখন একটু বড় হয়ে যায়।
একাকিত্বেরও ভালো দিক আছে, যদি আমরা তাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি। সব মানুষই কোনো না কোনো সময় একা হয়। এটি জীবনের অংশ। আর পিয়ানো—আমার কাছে—সংগীতের সেই একাকিত্বেরই একটি প্রতীক।
জর্জিয়ান ঐতিহ্য আপনার পিয়ানো বাজানোকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
আমার জর্জিয়ান পরিচয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাকে ভালোবাসি এবং ধরে রাখার চেষ্টা করি। এটি শুধু কোনো দেশের পরিচয় নয়। আমার স্বভাবের মধ্যেও এটি আছে। আমার আবেগে আছে। আমার স্বপ্ন দেখার ধরনেও আছে। আমি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ভালোবাসি—কখনো কোনো বস্তু, কখনো অনুভূতি, কখনো এমন কিছু যা স্পর্শ করা যায় না।
জীবনের বাস্তব হিসাব অনুযায়ী এগুলো হয়তো খুব ব্যবহারিক নয়। পিয়ানো বাজানোর ক্ষেত্রেও নয়। কিন্তু আমার কাছে এগুলোর মূল্য আছে।
আপনি এমনকি জঙ্গলের মধ্যেও কনসার্ট করেছেন—বনের মধ্যে গ্র্যান্ড পিয়ানো বসিয়ে। প্রকৃতির কি আপনার কাছে কোনো বিশেষ সংগীতগত অর্থ আছে?
আমি শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। সব কৃত্রিমতা সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
কোনো অ্যাকুস্টিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, কোনো সাজানো পরিবেশ থাকবে না—শুধু যন্ত্র, মানুষ আর প্রকৃতি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তখন শব্দ কেমন হয়। অভিজ্ঞতাটি অবিশ্বাস্য রকম ভালো ছিল। আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। তার শক্তিকেও। প্রকৃতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা মানুষ তৈরি করতে পারে না। সেখানে শব্দও যেন নিজের মতো করে শ্বাস নেয়।
আপনি ভেরবিয়ে ফেস্টিভ্যালে বাজাচ্ছেন। তখন কি প্রকৃতির জন্য সময় পাবেন?
আশা করি পাব।
ছয় দিনে আমার তিনটি কনসার্ট—একটি একক রিসাইটাল, একটি চেম্বার মিউজিকের সন্ধ্যা এবং অর্কেস্ট্রার সঙ্গে একটি একক কনসার্ট। তারপরও আমি সময় বের করব।
পাহাড়ে হাঁটতে চাই। হয়তো কোথাও বসে পিকনিক করব। আর ফন্ডু খাব। কনসার্টের পর কখনো কখনো শরীরকে শুধু নীরবতার কাছে নিয়ে যেতে হয়। সেখানকার পাহাড় হয়তো সেই নীরবতাটুকু দেবে।

পরিচিতি
জর্জিয়ান-ফরাসি পিয়ানোবাদক খাতিয়া বুনিয়াতিশভিলি সমকালীন ধ্রুপদি সংগীতের অন্যতম উজ্জ্বল শিল্পী। তার বাজনায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে মিশে থাকে গভীর আবেগ, নাটকীয়তা এবং একান্ত নিজস্ব আখ্যান। ১৯৮৭ সালের ২১ জুন জর্জিয়ার বাতুমিতে তার জন্ম।
ছোটবেলায় সংগীতপ্রেমী মায়ের উৎসাহে মাত্র তিন বছর বয়সে পিয়ানো শেখা শুরু করেন খাতিয়া। প্রতিভার পরিচয়ও মিলেছিল খুব তাড়াতাড়ি। ছয় বছর বয়সে তিবিলিসি চেম্বার অর্কেস্ট্রার সঙ্গে একক শিল্পী হিসেবে তার প্রথম পরিবেশনা। দশ বছর বয়সে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পিয়ানো বাজানোর সুযোগ পান।
তিবিলিসিতে তেংগিজ আমিরেজিবির কাছে প্রাথমিক সংগীতশিক্ষা শেষে খাতিয়া ভিয়েনায় যান। সেখানে কিংবদন্তি পিয়ানোবাদক ও শিক্ষক ওলেগ মাইজেনবার্গের কাছে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ২০০৮ সালে তেল আবিবে অনুষ্ঠিত আর্থার রুবিনস্টাইন আন্তর্জাতিক পিয়ানো মাস্টার্স প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার অর্জনের পর তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। একই বছর নিউইয়র্কের কার্নেগি হলে তার অভিষেক ঘটে।
এরপর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ট হল ও সংগীত উৎসবে নিয়মিত পরিবেশন করেছেন তিনি। তার রেকর্ড করা অ্যালবামগুলোর মধ্যে লিস্ট, শোপাঁ, মাদারল্যান্ড এবং ক্যালাইডোস্কোপ উল্লেখযোগ্য। তার শিল্পীসত্তার বৈশিষ্ট্য হলো—সুরকে কেবল নিখুঁতভাবে বাজানো নয়, বরং তার ভেতরের অনুভূতি ও মানবিক উত্তাপকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









