১৮৭৪ সালের গ্রীষ্মে, মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ফ্রিডরিখ নীৎশে লিখেছিলেন ‘শোপেনহাওয়ার এজ এডুকেটর’ —জার্মান নাম ‘শোপেনহাওয়ার আল্স এরৎসি-হার’। নীৎশের তার চার খণ্ডের ‘আনটাইমলি মেডিটেশন্স’ (‘উনৎসাইটগেম্যাসে বেট্রাখটুঙেন’)-এর তৃতীয় প্রবন্ধ। সেই সময়ের জার্মান সংস্কৃতি, শিক্ষা ও বিদ্যাচর্চা নিয়ে নীৎশের গভীর অসন্তোষ থেকেই লেখাটির জন্ম। তার কাছে শিক্ষা মানে কেবল জ্ঞান সঞ্চয় নয়; বরং নিজের সত্যিকারের সত্তাকে আবিষ্কার করার সাহস। আর শোপেনহাওয়ার ছিলেন তার কাছে এমন এক শিক্ষক, যাকে অনুসরণ করে মানুষ নিজের হয়ে উঠতে শেখে। প্রবন্ধটি ১৫ অক্টোবর ১৮৭৪ সালে, নীৎশের ত্রিশতম জন্মদিনে প্রকাশিত হয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দৈনিক এদিন অনলাইন ফ্রিডরিখ নীৎশে ‘র ‘শোপেনহাওয়ার এজ এডুকেটর’ বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর উন্মুক্ত করল। আসুন পাঠক আমরা জানি ফ্রিডরিখ নীৎশের শিক্ষক কেমন ছিলেন।
শিক্ষক হিসেবে শোপেনহাওয়ার: ফ্রিডরিখ নীৎশে
মানুষের মধ্যে পৃথিবীর সর্বত্র যে একটি স্বভাব দেখা যায়, তার নাম কী? বহু দেশ, বহু জাতি, বহু মহাদেশ ঘুরে আসা এক পথিকের কাছে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। সে বলেছিল—মানুষের মধ্যে আলস্যের প্রবণতা আছে।
কেউ হয়তো বলবে, মানুষের আসল স্বভাব ভীরুতা। কিন্তু আমি বলব, আলস্যই তার গভীরতর রোগ। মানুষ জানে যে সে একবারই পৃথিবীতে এসেছে। তার মতো আর কেউ কখনো আসবে না। তার অস্তিত্ব প্রকৃতির এক অনন্য ঘটনা। তবু সে এই সত্যটি নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখে। কেন? কারণ সে ভয় পায় অন্য মানুষকে। প্রতিবেশী কী ভাববে, সমাজ কী বলবে, প্রচলিত রীতি কী দাবি করবে—এইসবের কাছে সে নিজের মুখ বন্ধক রাখে। সে পোশাক পরে, কিন্তু নিজের জন্য নয়; অন্যের চোখের জন্য। সে মতামত পোষণ করে, কিন্তু নিজের চিন্তা থেকে নয়; চারপাশের মানুষের কাছ থেকে ধার করে। সে হাসে, কথা বলে, ভালোবাসে, ঘৃণা করে—কিন্তু প্রায় সবকিছুর মধ্যেই অন্যের ছায়া।
এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মানুষ নিজের মতো হতে ভয় পায়। আর নিজের মতো হওয়ার চেয়ে সহজ কাজ পৃথিবীতে আর নেই—যদি কেবল সে অলসতা ত্যাগ করতে পারে। তার ভেতরে তখন একটি কণ্ঠস্বর জেগে ওঠে— ‘নিজের মতো হও।’ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি কণ্ঠ তাকে থামায়— ‘এটা করো না। মানুষ কী বলবে?’ এই দ্বিতীয় কণ্ঠটাই সমাজের কণ্ঠ। এটি ভয়ের কণ্ঠ। এটি অভ্যাসের কণ্ঠ। এটি সেই অদৃশ্য পশুর কণ্ঠ, যে মানুষকে সারাজীবন পালের মধ্যে রাখে। শিল্পী, কবি ও সত্যিকারের চিন্তক এই পালবদ্ধ জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেন—প্রতিটি মানুষ একটি নতুন বিস্ময়। প্রকৃতির কোনো সৃষ্টিই দ্বিতীয়বার হুবহু ফিরে আসে না। তুমি নিজেও তার ব্যতিক্রম নও।
তাহলে কেন তুমি নিজের জীবন অন্যের হাতে তুলে দেবে? কেন তুমি এমন একজন হবে, যে নিজের আত্মার পরিবর্তে সমাজের তৈরি মুখোশ পরে বেঁচে থাকে? যে মানুষ নিজের সত্যিকারের সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তার জীবন ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে পড়ে। সে তখন খোলস—ভেতরে কোনো বীজ নেই। সে এমন এক ছায়া, যার নিজের কোনো আলো নেই। আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদও এখানেই। মানুষ নিজের জীবন যাপন না করে সময়ের জীবন যাপন করে। সে ভাবে, যুগ যা বলছে সেটিই সত্য। সংবাদপত্র যা বলছে, সেটিই সত্য। রাষ্ট্র যা চায়, সেটিই সত্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ যা বিশ্বাস করে, সেটিই সত্য। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সত্য প্রায়ই মানুষের অলসতার আরেক নাম। একদিন ভবিষ্যৎ আমাদের দিকে তাকাবে। তারা হয়তো দেখবে—আমরা কত কিছু বানিয়েছিলাম, কত প্রতিষ্ঠান গড়েছিলাম, কত মতামত প্রচার করেছিলাম। অথচ সেই সবের মধ্যে মানুষ কোথায় ছিল?
হয়তো তারা বলবে—এটি ছিল এমন এক যুগ, যখন মানুষ বেঁচে ছিল, কিন্তু কেউ নিজের জীবনের অধিপতি ছিল না।তাই তরুণ আত্মার প্রথম কাজ হলো সময়ের দাস না হওয়া। নিজেকে প্রশ্ন করা— ‘আমি কী সত্যিই ভালোবাসি?’ ‘কী আমাকে ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে?’ ‘কোন জিনিস আমাকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর দিকে টেনে নেয়?’ এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই তোমার প্রকৃত সত্তার কিছু চিহ্ন পাওয়া যাবে। নিজেকে খুঁজে পেতে হলে নিজের ভেতরে অন্ধকার গর্ত খুঁড়তে হবে—এমন নয়। মানুষ নিজের ভেতর যতই খুঁড়ুক, একের পর এক খোলসই পাবে। বরং নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাও। দেখো, কোন মানুষ, কোন বই, কোন শিল্প, কোন চিন্তা, কোন ভালোবাসা তোমাকে সত্যিই বদলে দিয়েছে।
যাদের তুমি শ্রদ্ধা করেছ, তাদের সামনে দাঁড় করাও। তারা হয়তো তোমার নিজেরই একটি ভবিষ্যৎ রূপ দেখাবে। তোমার প্রকৃত সত্তা তোমার ভেতরের কোনো গোপন কক্ষে বন্দী নেই। সে তোমার সামনে, তোমার ওপরে—একটি উচ্চতার মতো, যার দিকে তোমাকে উঠতে হবে। এই কারণেই প্রকৃত শিক্ষক আমাদের কী হতে হবে তা তৈরি করে দেন না। তিনি আমাদের ভেতরে ইতিমধ্যে যে মানুষটি জন্ম নিতে চাইছে, তাকে মুক্ত করে দেন। ‘শিক্ষক তাই নির্মাতা নন; তিনি মুক্তিদাতা।’ শিক্ষার প্রকৃত কাজ তোমার ওপর নতুন অঙ্গ বসানো নয়। তোমাকে এমন কোনো কৃত্রিম মুখ দেওয়া নয়, যা সমাজের চোখে সুন্দর দেখাবে। শিক্ষা হলো আগাছা সরিয়ে দেওয়া, যাতে তোমার নিজের বৃক্ষটি আলো পায়।
সূর্য তোমাকে তৈরি করে না। সে কেবল তোমার ওপর আলো ফেলে। বৃষ্টি তোমাকে সৃষ্টি করে না। সে কেবল তোমাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। একজন সত্যিকারের শিক্ষকও তাই। তিনি তোমাকে নিজের মতো বানাতে চান না। তিনি চান তুমি ‘নিজের মতো হয়ে ওঠো’। এই জন্যই জীবনের নানা অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে ফিরে পাওয়ার অনেক পথ থাকলেও আমি শিক্ষকদের কথা ভাবার চেয়ে ভালো পথ খুব কমই জানি। আর তাই আজ আমি এমন একজন শিক্ষকের কথা বলব, যিনি আমাকে শেখালেন নিজের কাছ থেকে পালিয়ে না যেতে—
আর্থার শোপেনহাওয়ার।
দুই
শোপেনহাওয়ারের লেখা প্রথমবার পড়ার অভিজ্ঞতা আমার কাছে কেবল একটি বই পড়ার ঘটনা ছিল না। মনে হয়েছিল, বহুদিন ধরে যে প্রশ্নটি আমার মধ্যে নিঃশব্দে ঘুরছিল, হঠাৎ কেউ তাকে ভাষা দিয়েছে। যৌবনে আমারও একটি স্বপ্ন ছিল—কোনো একদিন একজন সত্যিকারের দার্শনিক এসে আমাকে শিক্ষা দেবেন। তিনি আমাকে বলবেন কীভাবে বাঁচতে হয়। আমি তার কথা বিশ্বাস করব, কারণ নিজের ওপর তখনও আমার সম্পূর্ণ আস্থা ছিল না।
কিন্তু কী হওয়া উচিত একজন শিক্ষকের কাজ? একটি প্রচলিত মত বলে—শিক্ষককে ছাত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী গুণটি খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটিকে যত্ন করে বড় করতে হবে। আরেকটি মত বলে—ছাত্রের সব গুণকে সমানভাবে বিকশিত করতে হবে, যাতে তার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য তৈরি হয়। কিন্তু মানুষ কি এমন একটি যন্ত্র, যার প্রতিটি অংশ সমানভাবে পালিশ করতে হবে? যার ভেতরে সত্যিকারের শক্তি আছে, তার মধ্যে একটি কেন্দ্র থাকে। সেই কেন্দ্রের চারদিকে তার অন্য সব শক্তি ঘুরে বেড়ায়। প্রতিভা মানে সবকিছুতে সমান হওয়া নয়। প্রতিভা মানে কোনো একটি গভীর শক্তির চারদিকে নিজের সমগ্র সত্তাকে সংগঠিত করা।
একজন সত্যিকারের শিক্ষক তাই কেবল ছাত্রের প্রতিভা খুঁজে পান না; তিনি তার ‘কেন্দ্র’ খুঁজে পান। তিনি জানেন কোন আগুনটিকে জ্বালাতে হবে এবং কোন আগুনকে নিভতে দিতে হবে। কিন্তু এমন শিক্ষক কোথায়? আমি খুঁজেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অধ্যাপকদের মধ্যে। খুব কমই পেয়েছি।
আমাদের যুগ জ্ঞানকে ভালোবাসে, কিন্তু মানুষকে নয়। এ যুগ চায় পণ্ডিত। কিন্তু মানুষ তৈরির শিল্প ভুলে গেছে। একজন মানুষকে মানুষ করে তোলা যে কত কঠিন কাজ—এ কথা আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান উৎপাদন করে। কিন্তু জ্ঞানী মানুষ তৈরি করে না। অধ্যাপক তথ্য দেন। কিন্তু জীবনের কোনো দিকনির্দেশ দেন না। বিজ্ঞান বাড়ছে, কিন্তু মানুষের গভীরতা কি বাড়ছে? এ প্রশ্ন করলে আধুনিক মানুষ অস্বস্তি বোধ করে। কারণ সে জ্ঞানের পাহাড় বানিয়েছে, কিন্তু নিজের আত্মার জন্য একটি ঘরও তৈরি করেনি। বিজ্ঞান যদি কোনো বৃহত্তর মানবিক উদ্দেশ্যের অধীন না থাকে, তবে তার বৃদ্ধি মানুষের মুক্তি নয়—মানুষের আরও সূক্ষ্ম দাসত্ব।
আজ আমরা জ্ঞানকে জমাই। কিন্তু জানি না, সেই জ্ঞান দিয়ে কী করব। আমরা সত্যের কথা বলি। কিন্তু সত্যের জন্য কতটা মূল্য দিতে প্রস্তুত? এখানেই শিক্ষক ও পণ্ডিতের পার্থক্য। পণ্ডিত জ্ঞান জানেন। শিক্ষক জানেন, ‘জ্ঞান দিয়ে একজন মানুষকে কীভাবে বদলে দিতে হয়।’
তিন
শোপেনহাওয়ারের কাছ থেকে আমি দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেয়েছি তার বই থেকে নয়, তার ‘জীবন’ থেকে। একজন দার্শনিকের মূল্য তার বক্তব্যে যতটা, তার জীবনে তার চেয়েও বেশি। গ্রিক দার্শনিকেরা তা জানতেন। তাদের দর্শন কেবল বইয়ের পাতায় ছিল না। তাদের পোশাক, হাঁটা, কথা বলা, খাওয়া, বেঁচে থাকা—সবকিছুর মধ্যে তাদের দর্শন প্রকাশ পেত।শোপেনহাওয়ারের মধ্যেও আমি সেই মানুষটিকে দেখতে পেলাম। তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। রাষ্ট্রের প্রশংসা চাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান তাকে নিজের পথ থেকে সরাতে পারেনি। তিনি একা ছিলেন। আর একা থাকার ক্ষমতাই কখনো কখনো মানুষের স্বাধীনতার প্রথম লক্ষণ। সমাজ সাধারণ মানুষকে ভালোবাসে, কারণ সাধারণ মানুষ সমাজকে প্রশ্ন করে না। অসাধারণ মানুষ বিপজ্জনক। সে জিজ্ঞেস করে— ‘কেন?’ আর কোনো সমাজই ‘কেন’ প্রশ্নটি খুব বেশি পছন্দ করে না। তাই সমাজ প্রথমে তাকে ভয় দেখায়, তারপর তাকে একা করে, তারপর তাকে পাগল বলে, শেষে—যদি সে টিকে যায়—তাকে মহান বলে।
শোপেনহাওয়ারের জীবনেও এই পরীক্ষা এসেছিল। তার লেখা উপেক্ষিত হয়েছে। তার বই বিক্রি হয়নি। তার সময় তাকে চিনতে পারেনি। এমনকি একজন মহান মানুষও কখনো কখনো স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করেন। এখানেই আমরা তার দার্শনিক মুখের আড়ালে একজন আহত মানুষকে দেখতে পাই। তিনি একা ছিলেন। আর একাকিত্বের গভীরতা যে জানে না, সে বন্ধুত্বের অর্থও জানে না। একজন মানুষের চারপাশে যদি সমগ্র পৃথিবী থাকে, তবু সে একা হতে পারে। আবার একজন সত্যিকারের বন্ধুর পাশে থাকলে সমগ্র পৃথিবীর বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো যায়। স্বাধীন চিন্তার মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাই কেবল সত্য নয়—‘বন্ধুত্ব’। এমন একজন মানুষ, যার সামনে তাকে মুখোশ খুলতে হবে না। যার সামনে নীরবতাও মিথ্যা নয়।
চার
শোপেনহাওয়ারের সামনে তিনটি বিপদ ছিল—একাকিত্ব, সত্য সম্পর্কে সন্দেহ, এবং নিজের আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। এই তিন বিপদ শুধু তার নয়। আমাদের প্রত্যেকের। প্রথম বিপদ—একাকিত্ব। যে মানুষ নিজের মধ্যে একটি আলাদা পৃথিবী অনুভব করে, সে স্বাভাবিকভাবেই একা হয়ে যায়। অধিকাংশ মানুষ এই একাকিত্ব সহ্য করতে পারে না। তাই তারা ভিড়ে ফিরে যায়। কিন্তু ভিড় নিরাপদ হলেও সত্য নয়। দ্বিতীয় বিপদ—সন্দেহ। চিন্তা যত গভীর হয়, ততই মানুষ প্রশ্ন করে—আমি যা সত্য বলে জানি, তা সত্যিই কি সত্য? এই প্রশ্ন একসময় মানুষকে সাহসী করে, আবার দুর্বলও করতে পারে। সন্দেহ যদি সত্যের দিকে নিয়ে যায়, তা মূল্যবান। কিন্তু সন্দেহ যদি মানুষকে কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে না দেয়, তবে তা চিন্তা নয়—পঙ্গুত্ব। তৃতীয় বিপদ—অন্তরের কঠিন হয়ে যাওয়া। মানুষ যখন নিজের আদর্শকে ভুলে যায়, তখন তার আত্মা ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যায়। সে আর সৃষ্টি করে না। সে কেবল বিচার করে। সে আর ভালোবাসে না। সে কেবল সমালোচনা করে। সে আর নিজেকে বদলায় না। সে অন্যের ভুল গুনতে থাকে। এটাই সংস্কৃতির মৃত্যু।
মানুষের ভেতরে একটি আগুন থাকা দরকার। সেই আগুন তাকে নিজের চেয়ে বড় কিছু হতে ডাকবে। শোপেনহাওয়ারের মধ্যে সেই আগুন ছিল। তিনি জানতেন—মানুষের মধ্যে প্রতিভা আছে, কিন্তু প্রতিভা যথেষ্ট নয়। প্রতিভাকে সত্যের দিকে, সৌন্দর্যের দিকে, আত্মঅতিক্রমের দিকে নিয়ে যেতে হয়। সত্যিকারের সংস্কৃতির লক্ষ্য তাই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা নয়। ‘উচ্চতর মানুষ তৈরি করা।’
পাঁচ
কিন্তু এখানে একটি বিপদ আছে। একজন মহান মানুষের আদর্শ যদি এতই উঁচু হয় যে সাধারণ মানুষ তার দিকে তাকিয়ে কেবল হতাশ হয়, তবে সেই আদর্শের কী উপকার? শিক্ষা কি মানুষকে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মাটিকে ঘৃণা করতে শেখাবে? না। আদর্শের কাজ মানুষকে পঙ্গু করা নয়; তাকে চলতে শেখানো। শোপেনহাওয়ার আমাদের যে মানুষটির ছবি দেন, সে সুখের পেছনে ছুটে বেড়ায় না। সে নিজের আরামের জন্য বাঁচে না। সে সত্যের জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে। এই মানুষ জানে—জীবন সবসময় সুখের জন্য নয়। কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ হলো এমন কিছুর জন্য কষ্ট স্বীকার করা, যা তার নিজের জীবনকেও অতিক্রম করে। একটি বীরত্বপূর্ণ জীবন হয়তো সুখী জীবন নয়। কিন্তু তাতে অর্থ আছে। সে নিজের কাছে প্রশ্ন করে— ‘আমি কেন বেঁচে আছি?’ ‘আমি কী হতে চাই?’ ‘আমার জীবন কি কেবল রাষ্ট্রের কাজে, পেশার কাজে, বাজারের কাজে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য?’
যে মানুষ নিজেকে কেবল কোনো জাতি, রাষ্ট্র, পেশা, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের একটি ছোট যন্ত্র হিসেবে দেখে, সে নিজের অস্তিত্বের শিক্ষা এখনো পায়নি। মানুষ কোনো চলমান প্রক্রিয়ার ছোট্ট অংশমাত্র নয়। সে নিজেই একটি প্রশ্ন। আর তার জীবন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ। এখানেই সত্যিকারের শিক্ষকের প্রয়োজন। শিক্ষক তোমাকে উত্তর দেন না। তিনি তোমার মধ্যে এমন একটি প্রশ্ন জাগিয়ে দেন, যার উত্তর তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে। এই প্রশ্নের পর আর আগের মতো থাকা যায় না।
ছয়
মানবজাতির একটি বড় দায়িত্ব আছে—তার শ্রেষ্ঠ মানুষদের জন্ম নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু আমরা কী করি? আমরা প্রতিভাকে প্রশংসা করি, যতক্ষণ না তা আমাদের বিরক্ত করে। আমরা শিল্পীকে ভালোবাসি, যতক্ষণ তার শিল্প আমাদের আরামে ব্যাঘাত না ঘটায়। আমরা দার্শনিককে সম্মান করি, যতক্ষণ তিনি আমাদের বিশ্বাসকে প্রশ্ন না করেন। আমরা মহান মানুষকে স্মরণ করি, কিন্তু তাদের মতো হওয়ার কথা ভাবি না।
এ কেমন শ্রদ্ধা? এটি শ্রদ্ধা নয়। এটি নিরাপদ দূরত্ব থেকে পূজা। আমরা বলি—‘তিনি মহান।’ কিন্তু মনে মনে বলি—“আমি তার মতো নই, তাই আমার কোনো দায়ও নেই।’ এই প্রতারণা থেকে বের হতে হবে। মহান মানুষকে স্মরণ করার অর্থ তার মূর্তি বানানো নয়। তার জীবনকে নিজের জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো। নিজেকে জিজ্ঞেস করা—‘তিনি যা হওয়ার সাহস করেছিলেন, আমি কেন তা হতে পারছি না?’
এখানেই শিক্ষার প্রকৃত অর্থ। শিক্ষা তোমাকে সমাজের উপযোগী কর্মী বানানোর জন্য নয়। শিক্ষা তোমাকে নিজের গভীরতম সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করানোর জন্য।
সাত
প্রকৃতি অদ্ভুত শিক্ষক। সে অসংখ্য মানুষ জন্ম দেয়, কিন্তু খুব কম মানুষকে সত্যিই পরিণত করে। সে প্রতিভা ছুড়ে দেয় পৃথিবীর দিকে, যেন অন্ধকারে তীর ছোড়ে—কোথায় গিয়ে বিঁধবে, সে নিজেও জানে না। কত শিল্পী জন্ম নেয়, অথচ তাদের কেউ বোঝে না। কত দার্শনিক আসে, অথচ তাদের কথা শোনার মতো কান থাকে না। শোপেনহাওয়ারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একজন মহান চিন্তক জন্ম নিলেন, কিন্তু তার সময় তাকে প্রায় চিনতেই পারল না। এখানে আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত। কারণ একটি যুগের মূল্য শুধু তার কতজন শিক্ষিত মানুষ আছে, তা দিয়ে বোঝা যায় না। বরং বোঝা যায়—সে তার শ্রেষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে কী আচরণ করে। যে সমাজ প্রতিভাকে কেবল বাজারের মাপে বিচার করে, সে নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে। যে রাষ্ট্র শিল্পীকে কেবল প্রচারের কাজে ব্যবহার করে, সে শিল্পকে বোঝে না। যে বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তককে কেবল অধ্যাপকের পদে আবদ্ধ করে, সে চিন্তার স্বাধীনতা বোঝে না। আর যে সংস্কৃতি মানুষকে কেবল ভোক্তা বানায়, সে সংস্কৃতি নয়—একটি বিশাল বাজার। সত্যিকারের সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে এমন কিছু জাগায়, যা বাজার কিনতে পারে না।
আট
তাই আমাদের সামনে দুটি পথ। একটি পথ সহজ। সেখানে সবাই হাঁটে। সেখানে সম্মান আছে, নিরাপত্তা আছে, প্রতিষ্ঠা আছে। সেখানে তুমি তোমার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে। যা সবাই বলে, তা বলবে। যা সবাই করে, তা করবে। একদিন সবাই তোমাকে ভালো মানুষ বলবে।
অন্য পথটি কঠিন। সেখানে সঙ্গী কম। পথ উঁচু। প্রশ্ন বেশি। নিশ্চয়তা কম। সেখানে তোমাকে নিজের সঙ্গে লড়তে হবে।সমাজ তোমাকে ভুল বুঝবে। বন্ধুরা হয়তো তোমাকে ছেড়ে যাবে। তোমার নিজের ভেতর থেকেও ভয় উঠবে— ‘তুমি কি ভুল করছ?’ কিন্তু এই পথেই মানুষ নিজের কাছে ফিরে আসে। সংস্কৃতির প্রকৃত কাজ হলো এই দ্বিতীয় পথের মানুষের জন্য পথ তৈরি করা। তাদের রক্ষা করা নয়—তাদের শক্তিশালী হতে সাহায্য করা। কারণ প্রকৃত শিক্ষক এমন ছাত্র চান না, যে সারাজীবন তার পায়ের কাছে বসে থাকবে। তিনি চান এমন ছাত্র, যে একদিন তাকে অতিক্রম করবে। শিক্ষকের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো—ছাত্র যখন আর শিক্ষককে প্রয়োজন বোধ করে না। কারণ তখন শিক্ষক নিজের মধ্যে নয়, ছাত্রের মধ্যে বেঁচে থাকেন।
নয়
শোপেনহাওয়ারকে আমি তাই শুধু একজন দার্শনিক হিসেবে দেখি না। তিনি আমার কাছে একটি সম্ভাবনার প্রতীক। একজন মানুষ কেমন করে নিজের সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের সত্যকে রক্ষা করতে পারে—তিনি তার উদাহরণ। তিনি আমাকে শেখান, শিক্ষক মানে তথ্যের ভাণ্ডার নয়। শিক্ষক মানে এমন একজন মানুষ, যার জীবন তোমাকে নিজের জীবন নিয়ে লজ্জিত করে। যার সাহস তোমার কাপুরুষতাকে প্রকাশ করে। যার সততা তোমার অর্ধসত্যকে অসহ্য করে তোলে। যার স্বাধীনতা তোমার দাসত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। এমন শিক্ষককে ভালোবাসা সহজ নয়। কারণ তিনি তোমাকে সান্ত্বনা দেবেন না। তিনি তোমার মিথ্যা নিরাপত্তা ভেঙে দেবেন। তিনি তোমাকে বলবেন— ‘তুমি যা, তার চেয়ে বেশি কিছু হতে পারতে।’ এবং আরও কঠিন কথা বলবেন— ‘তোমার ব্যর্থতার জন্য পৃথিবীকে দোষ দিও না। নিজের ভেতরের ভয়কে দেখো।’ এই শিক্ষা কখনো আনন্দদায়ক নয়। কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষা আরাম দেওয়ার জন্য জন্মায়নি। তার কাজ জাগানো।
দশ
শেষ পর্যন্ত শিক্ষক আমাদের কোথায় নিয়ে যান? নিজেদের কাছেই। কিন্তু সেই ‘নিজে’ আমাদের পরিচিত মানুষটি নয়—যে প্রতিদিন একইভাবে বাঁচে, একইভাবে ভাবে, একই ভয় পায়। প্রকৃত নিজেকে খুঁজে পাওয়া মানে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো প্রস্তুত মানুষকে আবিষ্কার করা নয়। এটি একটি আরোহন। নিজেকে অতিক্রম করতে করতে নিজের কাছে পৌঁছানো। এই পথের কোনো তৈরি সেতু নেই। অন্য কেউ তোমার হয়ে এই নদী পার হতে পারবে না। অনেক পথ আছে, অনেক ধর্ম আছে, অনেক দর্শন আছে, অনেক শিক্ষক আছে। তারা তোমাকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু বিনিময়ে যদি তুমি নিজের স্বাধীনতা দিয়ে দাও, তবে সেই পথ তোমার নয়।
পৃথিবীতে একটি পথ আছে, যে পথে শুধু তুমি হাঁটতে পারো। কেউ তোমার হয়ে সেখানে হাঁটতে পারবে না। তাই জিজ্ঞেস কোরো না—‘এই পথ কোথায় যাবে?’ হেঁটে চলো। কারণ মানুষ কখনো কখনো সবচেয়ে উঁচুতে ওঠে তখনই, যখন সে জানে না পথ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। এই অজানার মধ্যেই শিক্ষার বড় রহস্য। একজন সত্যিকারের শিক্ষক তোমাকে নিজের উত্তর দেন না। তিনি তোমার মধ্যে এমন একটি সাহস জন্ম দেন, যার সাহায্যে তুমি নিজের উত্তর খুঁজতে পারো।
এই কারণেই একজন শিক্ষক কখনো কেবল অতীত নন। তিনি ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা। তিনি তোমার মধ্যে এমন এক মানুষকে ডাকেন, যে এখনো জন্ম নেয়নি। আর যদি তার ডাক সত্যিই শুনতে পাও, তবে একদিন তুমি বুঝবে— ‘শিক্ষক তোমাকে কিছু দেননি।’ তিনি কেবল তোমার ওপর থেকে সেইসব জিনিস সরিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো তোমাকে তোমার নিজের হতে বাধা দিচ্ছিল।
সেখানেই শিক্ষার শুরু। সেখানেই সংস্কৃতির শুরু। এবং সেখানেই মানুষের সত্যিকারের জন্ম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









