স্কুলে দুপুরের বিরতি। শিশুরা তখন হয়তো মাঠে, কেউ টিফিন খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে। অন্যদিকে এক কিশোরী বসে আছে শিক্ষিকার পাশে। সামনে খোলা পুরোনো একটি বই। বইটি সে পড়তে পারে না—অন্তত তখনও না। অক্ষরগুলো প্রাচীন গ্রিক।
কেন একটি কিশোরী এমন একটি ভাষা শিখতে চাইবে, যে ভাষায় তার চারপাশের কেউ কথা বলে না? যে ভাষার কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজন নেই? যে ভাষা তাকে চাকরি দেবে না, পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা দেবে না, এমনকি তার নিজের সময়েরও ভাষা নয়? সেই কিশোরীরর উত্তর ছিল খুব সরল— তিনি সেই ভাষাটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন।
আসলে ঘটনাটি আরও অদ্ভুত। সেই কিশোরী তখনও জানতেন না, এই অচেনা অক্ষরগুলোর ভেতর দিয়েই তিনি একদিন প্রবেশ করবেন প্রেম, শোক, আকাঙ্ক্ষা, অনুপস্থিতি ও স্মৃতির এক বিশাল জগতে। জানতেন না, দুপুরের সেই সামান্য পাঠ একদিন তাকে নিয়ে যাবে স্যাফোর কাছে—দুই হাজার বছরেরও বেশি দূরের এক কবির কাছে, যার কবিতার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে, অথচ যার কয়েকটি ভাঙা পঙ্ক্তি এখনও মানুষকে তাড়া করে ফেরে।
যে কিশোরীর কথা হচ্ছে তার নাম- অ্যান কারসন।
কানাডার কবি, অনুবাদক, ক্লাসিকসের পণ্ডিত এবং এমন এক লেখক, যার কবিতায় প্রাচীন গ্রিস ও আধুনিক জীবন পাশাপাশি হাঁটে। তার বইয়ে মৃত ভাষা হঠাৎ বর্তমানের মতো শোনায়; কয়েক হাজার বছরের পুরোনো প্রেম যেন আজ সকালের কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি; আর হারিয়ে যাওয়া কোনো কবিতার টুকরো কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ জীবনের চেয়েও বেশি কথা বলে।
কিন্তু অ্যান কারসনের এই অদ্ভুত সাহিত্যিক জগতের শুরু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নয়। শুরু হয়েছিল একটি বইয়ের দোকানে। ১৯৬৫ সালে, হ্যামিল্টনের একটি শপিং মলে ঘুরতে গিয়ে কিশোরী কারসনের চোখে পড়ে স্যাফোর কবিতার একটি দ্বিভাষিক সংস্করণ। এক পাশে প্রাচীন গ্রিক, অন্য পাশে ইংরেজি। তিনি তখনও গ্রিক জানেন না। তবু বইটি তাকে থামিয়ে দেয়। কিছু বই আমরা পড়ার আগেই চিনে ফেলি। কারসনের জন্য সেটি ছিল তেমন একটি বই।
তারপর শুরু হলো একটি ভাষার দিকে যাত্রা—যে ভাষা তার ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলোর একটি হয়ে উঠল। আর সেই যাত্রার প্রথম শিক্ষক ছিলেন তার স্কুলের ল্যাটিন শিক্ষিকা অ্যালিস কোয়ান। স্কুলে গ্রিক শেখানোর কোনো নিয়মিত ক্লাস ছিল না। তাই তারা দুপুরের খাবারের বিরতিতে বসে গ্রিক পড়তেন।
একজন কিশোরী। একজন শিক্ষক। একটি পুরোনো ব্যাকরণবই। আর কয়েক হাজার বছর আগের একটি কবির কণ্ঠ। অ্যান কারসনের সাহিত্যিক জীবনের শুরু হয়েছিল হয়তো সেখানেই—যেখানে একটি স্কুলের সাধারণ দুপুর হঠাৎ সময়ের বাইরে চলে যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









