ফরাসি চিত্রশিল্পী ক্লদ মোনের দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা চিত্রকর্ম ‘আইরিস’ প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে প্রদর্শিত হয়েছে। ফ্রান্সের প্যারিসে নিলাম প্রতিষ্ঠান সোথেবি’সের প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখতে পাচ্ছেন শিল্পপ্রেমীরা। নিলামে ছবিটির দাম অন্তত ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই হিসাবে এটি ফ্রান্সে নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামি চিত্রকর্মের রেকর্ড গড়তে পারে।
১৯২৪ বা ১৯২৫ সালে আঁকা ছবিটির আকার প্রায় পাঁচ ফুট বাই ছয় ফুট। মোনের শিল্পজীবনের শেষ দশকে আঁকা সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি এটি। দীর্ঘদিন ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় ছবিটি সম্পর্কে বাইরের মানুষের জানাশোনা ছিল মূলত সাদাকালো আলোকচিত্রের মাধ্যমে। এবারই প্রথম মূল চিত্রকর্মটি জনসমক্ষে আনা হয়েছে।
চিত্রকর্মটির সংরক্ষণও বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পকলার বিশেষজ্ঞ মারিয়ানে ম্যাথিউ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ছবিটি কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এমনকি এতে বার্নিশও করা হয়নি। তার মতে, মোনে যে ধরনের শিল্পকর্ম দর্শকদের দেখাতে চেয়েছিলেন, ‘আইরিস’ তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ছবিটি আবিষ্কারকে তিনি আবেগময়, গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শ্লুমবেরজে পরিবারের সংগ্রহ থেকে নিলামে তোলা হচ্ছে ছবিটি। সংগ্রহটির মালিক ছিলেন জেন শ্লুমবেরজে, যিনি জ্বালানি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এসএলবির সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্সেল শ্লুমবেরজের স্ত্রী। ১৯৫৬ সালে শিল্পকর্ম ব্যবসায়ী কাটিয়া গ্রানোফের মাধ্যমে পরিবারটি মোনের স্টুডিওতে থাকা বেশ কিছু চিত্রকর্ম সংগ্রহ করে। মৃত্যুর আগে মোনে এসব কাজ তার ছেলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন।
মোনের মৃত্যুর পর তার শেষ দিকের কাজগুলো নিয়ে শিল্পজগতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সোথেবি’সের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ থমাস বোমবার্ড ‘দ্য আর্ট নিউজপেপার’কে বলেন, তখন কিছু সমালোচক এসব কাজকে একজন অন্ধ শিল্পী কিংবা বার্ধক্যে অসুস্থ হয়ে পড়া শিল্পীর সৃষ্টি বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোনের এসব চিত্রকর্মের গুরুত্ব নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।
১৮৪০ সালে জন্ম নেওয়া মোনে ১৮৬০-এর দশকে প্যারিসে শিল্পীজীবন শুরু করেন। অগুস্ত রেনোয়া ও আলফ্রেড সিসলির মতো সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে করতে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব চিত্রশৈলী। ১৮৭২ সালে আঁকা তার ‘ইমপ্রেশন, সানরাইজ’ ছবির নাম থেকেই ইমপ্রেশনিজম শিল্পধারার নাম এসেছে। পরবর্তী সময়ে ‘হেস্ট্যাকস’, ‘হাউসেস অব পার্লামেন্ট’, ‘ওয়াটার লিলিজ’ ও ‘আইরিসেস’ সিরিজের মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। ১৯২৬ সালে ৮৬ বছর বয়সে মারা যান এই শিল্পী।
শ্লুমবেরজে পরিবারের সংগ্রহে মোনের আরও তিনটি চিত্রকর্ম রয়েছে, যেগুলো সৃষ্টির পর থেকে জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে ছিল। এগুলো হলো ১৯১৮-১৯ সালে আঁকা ‘উইপিং উইলো’, ১৯২৫-২৬ সালের ‘দ্য হাউস থ্রু দ্য রোজেস’ এবং ১৮৯৪ সালের ‘দ্য সেইন অ্যাট ভার্নন, দ্য ট্রি’। অক্টোবরের নিলামে এসব ছবির পাশাপাশি পল সেজান, গুস্তাভ কুরবে ও ক্যামিল ক্লদেলের শিল্পকর্মও তোলা হচ্ছে।
শ্লুমবেরজে পরিবারের সংগ্রহ শিল্পজগতে পরিচিত হলেও এর বেশির ভাগ কাজই সাধারণ মানুষের দেখার সুযোগ হয়নি। থমাস বোমবার্ডের ভাষ্য, সংগ্রহটির বিশেষত্বের পেছনে জেন শ্লুমবেরজের নিজস্ব শিল্পরুচির বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি প্রচলিত ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পকর্মের চেয়ে সুতিন এবং মোনের শেষ জীবনের বৃহৎ চিত্রকর্ম বেশি পছন্দ করতেন। মোনের এসব কাজের নাটকীয় তুলির টান ও রঙের ব্যবহারে বিমূর্ত শিল্পের বৈশিষ্ট্যও দেখা যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

‘আইরিস’ ছবিটির সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছিল ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩ কোটি ইউরো। তবে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয় এটি। ছবিটি ফ্রান্সের শ্লুমবেরজে সংগ্রহশালার কয়েকটি শিল্পকর্মের সঙ্গে নিলামে তোলা হয়েছিল।
ফ্রান্সে নিলামে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের রেকর্ডটি ছিল আমেদেও মোদিগলিয়ানির ‘হেড অব আ ক্যারিয়াটিড’ চিত্রকর্মের দখলে। ২০১০ সালে ছবিটি ৪ কোটি ৩২ লাখ ইউরোতে বিক্রি হয়েছিল।
সোথেবি’স জানিয়েছে, ‘আইরিস’-এর জন্য নির্ধারিত ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩ কোটি ইউরোর সম্ভাব্য মূল্য ছিল ফ্রান্সে নিলামে তোলা কোনো চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল্য।
২২ অক্টোবরের ওই নিলামে মোনের আরও তিনটি চিত্রকর্ম তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে ‘সউল প্লোরার’ (উইপিং উইলো) নামের ছবিটির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছিল ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ইউরো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









