আশি বছর বয়সে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে অসাধারণ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে পিছিয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। ফ্লাভিও পান ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট।
লুলার এই জয় শুধু ব্রাজিলের ক্ষমতায় ডানপন্থীদের ফিরে আসার সম্ভাবনাই ঠেকায়নি, বরং গোটা লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ধারাবাহিক সাফল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এটি পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের নীতির জন্যও বড় ধাক্কা।
অর্থনীতি ভালো, তবু অসন্তোষ
লুলা সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য কম ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলের অর্থনীতি মোট ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে ব্রাজিল জাতিসংঘের ক্ষুধাপীড়িত দেশের তালিকা থেকেও বেরিয়ে আসে। আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়ের হারও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে।
তারপরও সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক চাপ রয়ে গেছে। উচ্চ সুদের কারণে বহু মানুষ ঋণের বোঝায় জর্জরিত। অনলাইন জুয়াও বহু পরিবারের আর্থিক সংকট বাড়িয়েছে। এই অসন্তোষ বুঝতে পেরে লুলা ঋণ থেকে মুক্তির উদ্যোগ, অনলাইন বাজির ওপর বিধিনিষেধ, সামাজিক সুবিধা সম্প্রসারণ ও জ্বালানি ভর্তুকির মতো পদক্ষেপ নেন। ছয় দিনের কর্মসপ্তাহের বদলে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর উদ্যোগও তার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো ব্যয় কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ, কর হ্রাস এবং অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তার বাবাকে ক্ষমা করার কথাও বলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের দায়ে জাইর বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দেন ফ্লাভিও। সমর্থকদের কাছে এটি বিচারিক নিপীড়ন সংশোধনের সুযোগ, আর বিরোধীদের কাছে গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি।
নির্বাচন যখন সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত শুধু গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নয়, ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও পরিণত হয়। লুলা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আরোপ করেছে, জাইর বলসোনারোর বিচারের সঙ্গে যুক্ত এক সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং প্রকাশ্যে ফ্লাভিওর প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে।

লুলা অবশ্য সংগঠিত অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে থাকলেও বলেছেন, তা অবশ্যই জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে। তার বক্তব্যে নির্বাচনের মূল প্রশ্ন হয়ে ওঠে—ব্রাজিল কি নিজের পথ নিজে নির্ধারণ করবে, নাকি ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক কৌশলের অধীন হবে?
লুলার জয় লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর হন্ডুরাস, চিলি ও বলিভিয়াসহ কয়েকটি দেশে ডানপন্থীরা নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ও চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের জনসমর্থন কমার খবর এই প্রবণতার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমের জন্যও লুলার জয় স্বস্তির কারণ হতে পারে।
তবে এই ফল দিয়ে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের উত্থান শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়া হবে। বরং এটি দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন কোনো অনিবার্য স্রোত নয়। অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট মোকাবিলা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা এবং জাতীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার প্রশ্নও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
লুলার জয় তাই ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে একটি বার্তা দিচ্ছে: ডানপন্থীদের অগ্রযাত্রা অবশ্যম্ভাবী নয়, আর একবারের রাজনৈতিক সাফল্য চিরস্থায়ীও নয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









