জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সার্থক পরিসমাপ্তি হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ আয়োজন কোনো সরকারের সাফল্য তুলে ধরার জন্য নয়। বরং যুগে যুগে যারা ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী ছিল, তাদের কর্মকাণ্ড এবং সেই সময়ে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছে, তা তুলে ধরাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, এত কিছুর পর জাতির প্রত্যাশা কী, শহীদদের প্রত্যাশা কী এবং শহীদ পরিবারের প্রত্যাশাই বা কী সেসব বিষয়ও এই আয়োজনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থাকলেও জিয়াউর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা না থাকার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, যারা শাসক বা কর্তৃত্ববাদী ছিলেন, যারা আগ্রাসন ও জুলুম চালিয়েছেন, মূলত তাদের চিত্রই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। জিয়াউর রহমান তখন শাসক ছিলেন না বলে তার ২৬ মার্চের ঘোষণা প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, প্রদর্শনীতে আইয়ুব খানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে রাখা হয়েছে। কাউকে বাদ দেওয়া বা ভাগ করা হয়নি। ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বেগম জিয়া যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে মুক্তি পেয়েছেন, সেই বিষয়টিও ডকুমেন্টারিতে স্থান পেয়েছে।
ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যক্তির ইতিবাচক অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাসে যার যে কল্যাণকর অবদান রয়েছে, তার প্রতি তারা গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। এ ক্ষেত্রে তারা নির্মোহ ও বাস্তববাদী।
বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সমাজের কোনো শ্রেণি-পেশা কিংবা ধর্ম-বর্ণের মানুষই রেহাই পায়নি বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের সময় শাসকগোষ্ঠী দেশের মালিক হয়ে গিয়েছিল এবং জনগণকে প্রজা হিসেবে বিবেচনা করত। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাদের নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ‘ডিজাইনড ইলেকশনের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, একটি বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের নিজ দলের লোকজন এবং তাদের রাজনৈতিক অংশীদার এইচ এম এরশাদও এ বিষয়ে কথা বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ক্ষমতায় আসার পরপরই তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসও পূর্ণ না হতেই পিলখানায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। তাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গেও অসৎ আচরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সেনাবাহিনীর পর জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ ছিল না, তাদের মিথ্যা অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার নামে কার্যত বিচারিক হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার দাবি, জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন শীর্ষ নেতাকে একে একে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযম থেকে শুরু করে কাদের মোল্লা, দুই সাবেক আমির, তিন নায়েবে আমির, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও একজন নির্বাহী পরিষদ সদস্য ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, তৎকালীন সরকার তাকে দিয়েও অনেক কিছু করিয়েছে। পরবর্তীতে বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের বিরোধ তৈরি হলে এস কে সিনহা সরকারের সঙ্গে আপস করেননি। এরপর তাকে অস্ত্র ও জীবনহানির ভয় দেখিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো সরকার সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রধান বিচারপতিকে এভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে—এমন নজির নেই।
ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গেও কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, এসব নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান তাদের স্বজনরাও জানেন না। সম্ভবত তারা আর বেঁচে নেই। তবে তাদের জীবিত থাকা বা হত্যার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য তাদের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে তাদের দমনে হেলমেট বাহিনী ও মুগল বাহিনী পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তা টেকেনি। পরে সরকার সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়।
তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১ জুলাই আইনের মাধ্যমে আগের কোটা ব্যবস্থাই আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা নতুন করে আন্দোলনে নামে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে কোটা আবার ফিরে আসার পর ছাত্রসমাজ জেগে ওঠে। আন্দোলন দমনে ফ্যাসিস্ট কায়দায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনা আন্দোলনের প্রথম ধাপ বা জাগরণ তৈরি করে।
আন্দোলনে আবু সাঈদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ওপর হামলার পর মায়েরাও রাস্তায় নেমে আসেন। এর পরদিন ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ছিলেন সেই হত্যাকাণ্ডের প্রথম শিকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, আবু সাঈদ বুক পেতে গুলি নিয়েছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। পরপর তিনটি গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় দুজন এবং চট্টগ্রামে তিনজনকে হত্যা করা হয়। এরপর ১৮ জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে।
৩ আগস্টের পর পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সাধারণ কর্মকর্তা ও জওয়ানরা জনগণের ওপর আর অস্ত্র ধরতে ও গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের আশঙ্কা ছিল, অস্ত্র ধরলে লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
শফিকুর রহমানের দাবি, বাহিনী প্রধানদের শেখ হাসিনা ধমক ও গালিগালাজ করেছিলেন। এমনকি বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গেলেও আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে বাহিনীর সদস্যরা তাতে রাজি হননি।
২, ৩ ও ৪ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেন শফিকুর রহমান। তার অভিযোগ, ওই সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে লাশগুলো গায়েব করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিনও আশুলিয়ায় মানুষকে অর্ধমৃত অবস্থায় ট্রাকে তুলে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যার অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার পর তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আর টিকে থাকতে পারেনি। তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছিল।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাইয়ের প্রকৃত পরিসমাপ্তি তখনই হবে, যখন আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে এবং দেশের জনগণের অধিকার নিশ্চিত হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









