পুলিশ বাহিনীর অল্পসংখ্যক সদস্যের অনিয়ম-দুর্নীতির দায় পুরো বাহিনী নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে মেধাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে এ বৃত্তি দেওয়া হয়।
আইজিপি বলেন, বড় ধরনের অন্যায়, অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে পুলিশ যখন কাজ শুরু করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়। এ ধরনের ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ বিরুদ্ধে ভালো সাংবাদিকদের রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের পুলিশেও খারাপ লোক আছে। আমি একবার বলেছিলাম, আমাদের পুলিশের এক শতাংশ লোকও খারাপ না। এটা নিয়ে মিডিয়াতে বলা শুরু হলো, তিনি পুলিশের অনিয়মকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। না, আমি বিভিন্নভাবে তথ্য নিয়েছি—আমাদের মধ্যে অপরাধে জড়িত শূন্য দশমিক সত্তর শতাংশ। এক পার্সেন্টও হয় না। ওই অল্প সংখ্যক করাপটেড সদস্যের জন্য আমার গোটা পুলিশ বাহিনী কেন দায় নেবে?’’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে পুলিশ প্রধান বলেন, তিনি কোনো অপরাধ করলে সেটিই যেন সংবাদে তুলে ধরা হয়। তবে অপবাদ দিয়ে কারও মনোবল নষ্ট করার বিরুদ্ধেও সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যাংকগুলো শূন্য হয়ে গেছে। আমানতের টাকা ফেরত পেতে মানুষকে ব্যাংকে আবেদন করতে হচ্ছে। তাই কোনো ষড়যন্ত্র না করে সবাইকে মিলে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা ঠিক না থাকলে দেশ অকার্যকর হবে
আইজিপি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর নতুন প্রজন্মের অনেকে ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাহাসে জড়াচ্ছে এবং উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না থাকলে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, মানুষের বাড়ি, গাড়ি ও সম্পদ থাকলেও বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা না থাকলে দেশ অকার্যকর হয়ে যাবে।
আইনের সীমাবদ্ধতায় অপরাধীরা ফের জড়াচ্ছে অপরাধে
মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান আইজিপি।
তিনি বলেন, মাদক ও ছিনতাইবিরোধী অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা সম্ভব হয় না। পরে তারা আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। প্রত্যেক মাদক কারবারি ও প্রত্যেক ছিনতাইকারী একাধিকবার আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাদের ওইভাবে আটকে রাখতে পারিনি। তারা আবার বের হয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’’
মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আইজিপি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।
মাদক থেকে তরুণদের দূরে থাকার আহ্বান
মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে উল্লেখ করে পুলিশ প্রধান বলেন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক নানা নামে তরুণদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় এসব মাদককে ‘এনার্জি ট্যাবলেট’ বা আকর্ষণীয় অন্য কোনো নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সন্তানদের সচেতন করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, সাময়িক কৌতূহল বা কোনো প্ররোচনায় মাদকের ভয়াল থাবা যেন তাদের স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। মাদক একটি মরণফাঁদ।
একই সঙ্গে মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট গেমে অতিরিক্ত আসক্তিকেও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্যের আসক্তির মতো ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিকে তোমরা ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি যেন তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।’ দেশের নাগরিক হিসেবে আইন মেনে চলা এবং অন্যদেরও আইন মেনে চলতে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন পুলিশ প্রধান।
দুই বছরে মেধাবৃত্তি পেল ২,১১৩ শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থায়নে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮০১ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ২৭২ জন শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি পেয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮৪৫ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ১৯৫ জন শিক্ষার্থীও এ বৃত্তির আওতায় এসেছে।
২০২৪ ও ২০২৫—এই দুই বছরে বাংলাদেশ পুলিশের মেধাবৃত্তি পেয়েছে মোট ২ হাজার ১১৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শনিবার ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬০ জনের হাতে বৃত্তি তুলে দেওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মাধ্যমে মেধাবৃত্তি দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেন এআইজি ইসমাইল হোসেন। অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা, অভিভাবক ও বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









