জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন বীর সেনানায়ক ছিলেন। অন্যদিকে দেশের রাজনীতির এক অনন্য রূপকার। তাঁর উত্থান কেবল একটি সময়ের প্রয়োজনে নয়, বরং ছিল একটি দিকহারা জাতির জন্য কাঙ্খিত দিকদর্শন। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন শুধুমাত্র একটি অতীত অধ্যায় নয়, বরং তা তরুণ প্রজন্মের সামনে আজও প্রাসঙ্গিক। সময়ের প্রয়োজনে, সংকটের মুহূর্তে কিংবা ভবিষ্যতের সন্ধানে। ১৯৭৫-এর উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিতে জিয়াউর রহমান আবির্ভূত হন এক 'নির্মাতা রাষ্ট্রনায়ক' হিসেবে। তাঁর অভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা এক বাস্তবতার অনিবার্য ফলাফল। তিনি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন, অর্থনীতিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং জনগণের মনোবলে চরম হতাশাগ্রস্ত।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে তিনি যে দর্শন নির্মাণ করেন, তা ছিল আত্মনির্ভরতার, শৃঙ্খলার এবং সর্বোপরি, গণভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার এক নতুন খসড়া। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ', একটি তাত্ত্বিক ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা, যা একদিকে জাতীয় ভূখন্ডের প্রতি আনুগত্যকে প্রধান করে। শহীদ জিয়া বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক সফলতার মাপকাঠি কেবল গণতন্ত্রের আবরণ নয়, বরং এর মূলে থাকা উচিত উৎপাদনশীলতা, কর্মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা। তাঁর শাসনামলে 'কর্মই শ্রেষ্ঠ' এই বার্তা তিনি শুধু ভাষণে নয়, নীতিতে বাস্তবায়িত করেছিলেন। তিনি ব্যক্তির চেয়ে দল আর দলের চেয়ে দেশকে বড় করে দেখেছিলেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজান, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করেন, গ্রাম পর্যায়ে কৃষি উন্নয়ন জোরদার করেন, এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা তৈরি করেন। তরুণরা আজ যখন কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দোলাচলে, তখন জিয়াউর রহমানের কর্মমুখী চিন্তাধারা আবারও আলোচনায় আসা উচিত, যেখানে রাজনীতি আর শাসন কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের শৃঙ্খলিত রূপরেখা।
বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ সময়ের সীমা অতিক্রম করে জাতির প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। শহীদ জিয়া তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেই নন, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সাহসী রূপকার হিসেবেও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার তিনি ছিলেন অবিচল। ব্যক্তি জিয়ার মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ, দর্শন ও দেশগঠনের স্বপ্ন আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ সময়ের সীমা অতিক্রম করে জাতির প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। শহীদ জিয়া তাঁদের অন্যতম।
তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেই নন, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সাহসী রূপকার হিসেবেও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত। জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল। সেই কঠিন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু স্বাধীনতা অর্জনই যথেষ্ট নয়, স্বাধীনতার সুফল জনগণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে না পারলে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘জনসাধারণের সেই প্রত্যাশা আজও পূর্ণ হয়নি। তাহা পূরণ করবার জন্য আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে’। এই আহ্বান ছিল মূলত স্বাধীনতার চেতনায় দেশ পুনর্গঠন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণকে নতুন উদ্যমে দেশগঠনে সম্পৃক্ত করার ডাক। তিনি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি রক্ষা করতে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, সততা, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা এবং দেশপ্রেম।
সেই ভাষণে তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, কিছু দেশবিরোধী চক্র বিদেশি প্ররোচনায় বিভ্রান্ত যুবকদের ব্যবহার করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁর এই দূরদর্শিতা আজও বিস্ময় জাগায়। কারণ সময় বদলেছে, কিন্তু ষড়যন্ত্রের ধরন বদলালেও উদ্দেশ্য বদলায়নি। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রকৃত শক্তি জনগণ।তাই তিনি গ্রাম ও কৃষিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত নির্মাণ এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে তাঁর অবদান আজ ও স্মরণীয়। তৎকালীন বিশ্বে বাংলাদেশকে যখন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অপমান করা হতো, তখন জিয়াউর রহমান জাতিকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছিলেন।
তিনি জনগণকে বুঝিয়েছিলেন, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় এবং মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ২৬ মার্চের সেই ভাষণেই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেনঃ ‘বাংলাদেশ চিরদিন বেঁচে থাকবে। আমাদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে আমরা কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হতে দিব না’। এই উচ্চারণ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও তাঁর এই অবস্থান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জিয়াউর রহমান তরুণ সমাজকে জাতির ভবিষ্যৎ শক্তি হিসেবে দেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যুবসমাজ যদি আদর্শ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাই তিনি যুবকদের হতাশা, সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে বের হয়ে শিক্ষা, উৎপাদন ও দেশগঠনের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশেও জিয়াউর রহমানের সেই নতুন শপথ নতুনভাবে গুরুত্ব বহন করে।
রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের সময়ে তাঁর আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়, বরং দায়িত্ব, সততা, ত্যাগ এবং জনগণের কল্যাণে অবিচল প্রতিশ্রুতি। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনকে কেউ কেউ কেবল অতীতের দলীয় ভাবনায় আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে জিয়ার চিন্তা ছিল সময়ের অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর দর্শনে ছিল। ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তববাদিতা ও জনমানুষের অন্তর্জগৎকে বোঝার এক অনন্য সক্ষমতা। আজকের তরুণদের সামনে যখন রাজনীতি বিভক্ত, নেতৃত্ব সংকটে, আদর্শ বিলুপ্তির পথে তখন শহীদ জিয়ার চিন্তাকে নতুনভাবে পাঠ করা প্রয়োজন। তাঁকে শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নয়, বরং একজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবেও অনুধাবন করা দরকার।
যেহেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একজন রাজনৈতিক চরিত্র ছিলেন, এ প্রেক্ষাপটে তাঁর ভক্ত ও অনুসারীর পাশাপাশি সমালোচক থাকাটাও একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ দুইয়ের কোনো পক্ষই অস্বীকার করতে পারবে না যে, বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত যে ক'জন স্থাপন করেছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। জিয়াউর রহমানের এই আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর সুযোগ্য সন্তান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা দিয়েছেন, যা তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্খা, অধিকার ও সম্ভাবনার প্রতিফলন।
জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শনকে ধারণ করতে হলে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরির এই কর্মসূচিকে গ্রহণ ও অনুসরণ করাই সময়ের দাবি। তারেক রহমানের মধ্যেই জিয়াউর রহমানের আদর্শিক প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছে তরুণ প্রজন্ম। ১৯ দফা যেমন পথ দেখিয়েছিল এককালে, তেমনি ৩১ দফা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য একটি দৃড় নৈতিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে তুলবে। এদেশের সচেতন তরুণ প্রজন্ম যদি নিজেদের দায়িত্ব ও আত্নপরিচয়ের জায়গা থেকে রাজনীতিকে ধারণ করতে চায়, সেক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশে বিনির্মাণে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শণ তাদের অন্যতম প্রধান পাথেয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









