বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করছে, জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির ফলে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিদিনই নতুন আক্রান্ত শিশুর সন্ধান মিলছে, হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে শত শত শিশু, আর মৃত্যুর মিছিলও পুরোপুরি থামছে না।
গত ১৫ মার্চ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে প্রায় ৬০০ শিশুর মৃত্যু এবং ৮২ হাজারের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। সরকার তিন ধাপে সারা দেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করেছে। কিন্তু টিকা দেওয়ার পরও বহু এলাকায় সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় কর্মসূচির সফলতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে যথাযথ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা দেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। অথচ আট সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গণরোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন। হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সাধারণত অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর টিকা কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেশের সব অঞ্চলে সেই কভারেজ অর্জিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেক শিশু বয়সের কারণে, অনেকে সচেতনতার অভাবে, আবার কেউ কেউ ভৌগোলিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে টিকার আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে। ফলে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও একটি বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। হাসপাতালগুলোতে এখন দুই মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশুদের সংখ্যা বেশি, যাদের অনেকেই টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ, কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ বিদ্যমান থাকলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে এই নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুরা। তাই শুধু টিকা প্রদান নয়, সংক্রমণ শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আশাবাদী বক্তব্য স্বাগত জানানো যায়, তবে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। টিকাদান কর্মসূচির স্বাধীন মূল্যায়ন, অ্যান্টিবডি পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জনগণের কাছে স্বচ্ছ তথ্য তুলে ধরতে হবে, যাতে গুজব বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ প্রতিদিন শিশুদের মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে কেবল টিকা প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, শতভাগ কভারেজ অর্জন এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি দূর করার মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









