আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের পরবর্তী জাতীয় বাজেট পেশ করবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ইতোমধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রকাশ করা হয়েছে। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। আগামী বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়টি। সে কারণে বাজেটের আকারও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাজেটের আকার বাড়লে সরকারের আয়ের উৎসও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাড়বে ব্যয়ের খাত এবং বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের উৎস কোথা থেকে আসবে? নিঃসন্দেহে শুল্ক বা কর বৃদ্ধি করতে হবে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর। সুতরাং, এবারের বাজেট সাধারণ মানুষকে কতটা স্বস্তি দেবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকেই ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে আসছে। বাংলাদেশের প্রথম বাজেট প্রণয়ন করা হয় মুজিবনগর সরকারের সময়, ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই। সে সময়ের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল দৈনন্দিন ও অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহের জন্য, যার প্রধান উৎস ছিল বহির্বিশ্বের অনুদান। পরবর্তী সময়ে, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাজেটেও একই চিত্র দেখা যায়। তবে পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়ন করা হয় ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে। সে সময় মোট বাজেটের আকার ছিল ৭১৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং ঘাটতি ছিল ৪২৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ।
অন্যদিকে, চলমান বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ২৮ শতাংশ। আর আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ২৬ শতাংশ। সুতরাং প্রশ্ন হলো—ঘাটতি বাজেট আর কতদিন? আবার গত বছর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু চলমান অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও সরকার ভিন্ন, তাই আদায় কৌশলও ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জন সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধি নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—এমন উচ্চাভিলাষী বাজেট জনগণের মধ্যে কতটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
যদিও বাজেট বৃদ্ধি রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক। কারণ দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটাতে হলে সরকারের উন্নয়ন খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতেই হবে। কিন্তু সেই বৃদ্ধি বর্তমান সময়ের উপযোগী কি না, সেটিই এখন ভাববার বিষয়। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি না পেলে দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না, এটি যেমন সত্য, তেমনি অতিরিক্ত বাজেট বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে বড় বাজেটের পক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, “বাজেট বড় করা না হলে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আবার উন্নয়ন বাজেটও বাড়াতে হবে। না হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে না।”
বিষয়টি অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, বর্তমান অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এই বাজেট কতটা যৌক্তিক হচ্ছে? কারণ, গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যা এক ধরনের পরোক্ষ কর হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এর ভোগান্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষসহ প্রায় সব শ্রেণির মানুষই পড়েছেন। এদিকে এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি (ওএমএস) এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন খাতে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ রাখা হতে পারে। সুতরাং, এই ভর্তুকির অর্থ আসবে সাধারণ মানুষের দেওয়া আয়কর ও শুল্ক থেকেই। আর শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়েই।
১৫ মে, ২০২৬ তারিখে যুগান্তর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল “৫০ পণ্য ও সেবায় বাড়ছে ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক”। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্ব আদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অন্তত ৫০টি পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহে উৎসে কর বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনা এবং অতি ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেও উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, বিশেষ করে দোকানদারদের ভ্যাট জালের আওতায় আনতে প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনাও করা হয়েছে। আবার, ১৮ মে ২০২৬ তারিখে “পরোক্ষ করের ওপর অতি নির্ভরশীলতা: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব” ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত কতৃক শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন বিষয়ে মত দেন, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের ওপর অতিনির্ভরতা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে”।
অন্যদিকে, ১৫ মে ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের ভোগ্যপণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর বৃদ্ধি বা করের আওতায় আসতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কোমল পানীয় ও প্রসাধনী পণ্য, আমদানিনির্ভর ভোজ্য তেল ও শিল্পের কাঁচামাল, ডিজিটাল ও অনলাইন সেবা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন, এমনকি ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন ও কর ব্যবস্থাও।
অপরদিকে, ইত্তেফাকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রণোদনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বড় শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় সীমিত করার আলোচনা রয়েছে। রপ্তানিমুখী কিছু খাতে বিদ্যমান কর অবকাশ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হাইটেক খাতে সীমিত মেয়াদের কর প্রণোদনা অব্যাহত থাকতে পারে।
সুতরাং, বাজেটটিতে প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় জোর দেওয়া হয়েছে। অথচ পরোক্ষ কর এমন একটি ব্যবস্থা, যা দিনমজুর থেকে শিল্পপতি সব শ্রেণির মানুষকেই সমানভাবে প্রভাবিত করে; এখানে কারও আয়ের স্তর বিবেচনা করা হয় না। অন্যদিকে, প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি করা হলে মূলত বিত্তবানরাই করের আওতায় আসতেন এবং নিম্নআয়ের জনগণ অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেত। তবে শুধু এবারের বাজেটেই এমনটি ঘটেছে, তা নয়। বিগত কয়েকটি বাজেট পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, বিত্তবানদের বিশেষ করে করপোরেট খাতকে বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বিপরীতে শুল্ক ও অন্যান্য পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়েছে। আবার যারা কর দেন তারা হয়রানির শিকার হন বিপরীত দিকে যারা কর দেন না তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড কিছু মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা সরকারের জন্যও স্বস্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা বেকারত্ব কতটা কমবে, কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো এই পরোক্ষ করের চাপ থেকে জনগণ কতটা মুক্তি পাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









