শহরের যান্ত্রিক কোলাহল কিংবা গ্রামের চিরচেনা শান্ত মেঠোপথকোথাও যেন আজ আর স্বস্তি নেই। হঠাৎ করেই হয়তো কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে আপনার নিজের এলাকাতেই শোনা গেল একদল মানুষের ক্ষুব্ধ আর উন্মত্ত চিৎকার। 'চোর, চোর' বা 'ছিনতাইকারী' বলে ধাওয়া করে ধরা হলো এক কিশোর বা যুবককে। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হলো কিল-ঘুষি, লাঠিপেটা। কেউ একবারও থামতে বলল না, কেউ জানতে চাইল না ছেলেটি সত্যিই অপরাধী কি না। ছেলেটির রক্তাক্ত মুখ, বাঁচার জন্য করুণ আকুতি, আর দূর থেকে ছুটে আসা তার অসহায় মায়ের গগনবিদারী আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় জনতার পাশবিক উল্লাসে। আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া এমন 'মব জাস্টিস' বা গণপিটুনি আজ যেন অতি পরিচিত এক দৃশ্য। অথচ, যে সমাজ নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে বিচারহীনতার বর্বরোচিত উল্লাসে মাতে, সে সমাজে 'আইনের শাসন' এক অলীক স্বপ্ন বৈ আর কিছু নয়।
একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন হলো সেই অদৃশ্য সুতো, যা সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিরাপত্তা ও ন্যায়ের বাঁধনে বেঁধে রাখে। বাংলাদেশের সংবিধানে আইনের শাসনের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং জোরালোভাবে বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" অন্যদিকে, ৩১ অনুচ্ছেদে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। এমনকি ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম প্রেক্ষাপটে দাঁড়ালে আমরা কী দেখি? যখন আমাদের নিজ নিজ এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তখন আমরা কি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পুলিশ বা প্রশাসনের দ্বারস্থ হই? নাকি নিজেরাই বিচারক আর জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দণ্ডবিধির (Penal Code) প্রকাশ্য লঙ্ঘন করি?
আমরা কথায় কথায় রাষ্ট্রের, বিচারব্যবস্থার আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র সমালোচনা করি। চায়ের কাপে ঝড় তুলে আমরা বলি দেশে বিচার নেই, আইন কেবল গরিবের জন্য, প্রভাবশালীদের টিকিটিও ছোঁয়া যায় না। কিন্তু একবার কি নিজেদের বিবেকের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করেছি, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি? আইনের শাসন কেবল আদালত কক্ষের চার দেয়ালে, বিচারকের রায়ে বা পুলিশের খাতায় বন্দি কোনো বিষয় নয়। এটি একটি নিরন্তর চর্চা, একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যা শুরু হতে হয় পরিবার ও সমাজ থেকে।
রাস্তার সিগন্যাল অমান্য করে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ব্যক্তিগত কাজ দ্রুত উদ্ধারের জন্য টেবিলের নিচ দিয়ে ঘুষ দেওয়া, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অন্যের জমি দখল করা কিংবা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা এই প্রতিটি কাজই আইনের শাসনের বুকে এক একটি কুঠারাঘাত। যে নাগরিক নিজে সামান্য যানজট এড়াতে ট্রাফিক আইন ভাঙে, কিংবা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে অবৈধ উপায় অবলম্বন করে, তার মুখে রাষ্ট্রের বিচারহীনতা নিয়ে আক্ষেপ করাটা বড়ই বেমানান। আমরা ভুলে যাই যে, নাগরিকের ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতা ও নৈতিক স্খলনই মূলত একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার জন্ম দেয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমাদের মানসিকতা এবং অন্যায়ের প্রতি আমাদের সুবিধাবাদী নীরবতা। আমরা যখন আমাদের এলাকায় কোনো অন্যায় হতে দেখি, তখন কয়জন তার প্রতিবাদ করি? প্রতিবেশী যখন তার স্ত্রীকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে, আমরা 'পারিবারিক বিষয়' বলে এড়িয়ে যাই।
প্রভাবশালী কেউ যখন খাসজমি বা সাধারণ মানুষের জায়গা দখল করে, আমরা 'নিজের তো ক্ষতি হচ্ছে না' ভেবে চোখ বন্ধ রাখি। এই আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা আমাদের অন্ধ করে রেখেছে। অথচ, আজ যে অন্যায় অন্যের ঘরে হানা দিচ্ছে, কাল তা আপনার-আমার ঘরেও আসতে পারে। একটি সমাজে যখন অপরাধীরা দেখে যে মানুষ আইনকে ভয় পায় না, কিংবা সাধারণ নাগরিকরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় না নিয়ে নীরব থাকে, তখন অপরাধের শেকড় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত হয়। আইনের শাসনকে তখনই পদদলিত করা সবচেয়ে সহজ হয়, যখন নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে চরম উদাসীন থাকে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমাদের আইনি দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৪৪ ধারা অনুযায়ী, সমাজে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের তথ্য পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো প্রতিটি নাগরিকের আইনগত দায়িত্ব। আমরা সন্দেহভাজন অপরাধীকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করতে পারি, কিন্তু কোনোভাবেই তাকে শাস্তি দিতে পারি না।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো বীরত্ব নয়, বরং এটি চরম অজ্ঞতা ও দণ্ডবিধির আওতায় একটি ভয়ংকর অপরাধ। মব জাস্টিসে অংশ নেওয়া প্রতিটি মানুষ আইনের চোখে খুনি বা আক্রমণকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই আবেগতাড়িত হয়ে নয়, বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্র বা সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিককে আইনের পাহারাদার হতে হবে। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত না করার যে আইনি ও মানবিক শিষ্টাচার, তা আমাদের মজ্জাগত করতে হবে। এলাকায় কোনো ছোটখাটো বিবাদ বা অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন বা সাধারণ আলোচনার মাধ্যমে আইনের প্রাথমিক বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে, আইনের শাসন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো ঐশ্বরিক উপহার নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের প্রতিদিনের চর্চার ফসল। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত হলো আইনের প্রতি নাগরিকদের নিঃশর্ত শ্রদ্ধা। একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে কেবল পুলিশ বা আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও আইনের প্রতি সমানভাবে দায়বদ্ধ হতে হবে। আসুন, পরিবর্তনের শুরুটা হোক আমাদের নিজেদের থেকে, আমাদের নিজের চিন্তাধারা থেকে এবং আমাদের নিজের এলাকা থেকে। যে হাতে আইন ভাঙার প্রবণতা ছিল, সে হাতেই আজ উঠুক আইন রক্ষার দৃঢ় শপথ। তবেই হয়তো একদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাবে, যেখানে আইন হবে সবার জন্য সমান, আর আইনের শাসন হবে সমাজের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









