ডক্টর খলিলুর রহমান এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি দীর্ঘদিনের একজন কূটনীতিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসেবায় কাজ করেছেন। জাতিসংঘেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এবার তিনি আরও বড় একটি দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
ভোটাভুটিতে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেই তিনি এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ৯৯ ভোট পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৯১ ভোট। এটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই একটি গৌরবের বিষয়। কারণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশ এর আগে মাত্র একবার বসেছিল। প্রায় চার দশক পর আবার একজন বাংলাদেশি এই পদে নির্বাচিত হলেন। তবে গর্বের পাশাপাশি একটি বাস্তব প্রশ্নও আছে। এই পদে থেকে খলিলুর রহমান আসলে কী করতে পারবেন? বাংলাদেশের জন্য তিনি কতটুকু সুবিধা আদায় করতে পারবেন?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো ক্ষমতাবান কোনো পদ নয়। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবও নন। তার হাতে কোনো সেনাবাহিনী নেই। কোনো দেশের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও নেই। তার মূল কাজ হলো সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করা। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা। আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তাই এই পদকে প্রভাবশালী বলা যায়। কিন্তু নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যায় না। তবুও এই পদের গুরুত্ব কম নয়।
কারণ সাধারণ পরিষদই হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ। এখানে ১৯৩টি দেশ সমান ভোটাধিকার নিয়ে বসে। বিশ্বের বড় বড় নেতা এখানে বক্তব্য দেন। নতুন ধারণা, নতুন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের বড় ক্ষেত্র এটি। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রোহিঙ্গা সংকট। আজ প্রায় এক দশক হতে চলল। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাস করছে। এই সংকটের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে কক্সবাজারে রয়েছে ১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। ভাসানচরে রয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের সর্বশেষ যৌথ তথ্য এটাই বলছে। অনেক সময় বিভিন্ন সংখ্যা শোনা যায়। কেউ বলে ১২ লাখ। কেউ বলে ১৩ লাখ। এর কারণ হলো নতুন করে কিছু রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। আবার কেউ অন্যত্র চলে যায়। তবে সরকারি ও জাতিসংঘের যৌথ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য গত কয়েক বছরে বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। চীন মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘও বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। কারণ সমস্যার মূল জায়গা মিয়ানমার। সেখানে এখনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা চায়। নিরাপত্তা চায়। বসতভিটায় ফেরার অধিকার চায়।
অন্যদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখানেই খলিলুর রহমানের ভূমিকার প্রশ্ন আসে। তিনি কি সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন? সরাসরি উত্তর হলো, একা পারবেন না। কারণ এই পদের ক্ষমতা সেই ধরনের নয়। তিনি কোনো দেশকে বাধ্য করতে পারবেন না। মিয়ানমারকে নির্দেশ দিতে পারবেন না। প্রত্যাবাসনের তারিখ ঘোষণা করলেও সেটি কার্যকর করার ক্ষমতা তার হাতে থাকবে না। তবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে পারবেন। বড় শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন। মানবিক সহায়তার জন্য নতুন সমর্থন সংগ্রহে ভূমিকা রাখতে পারবেন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বিষয়টি যেন বিশ্ব ভুলে না যায়, সেই কাজ করতে পারবেন। এটি ছোট কোনো বিষয় নয়। কারণ বর্তমানে রোহিঙ্গা সংকট আরেকটি বড় সমস্যার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বারবার সতর্ক করছে যে অর্থের সংকট বাড়ছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমও চাপে পড়ছে। যদি বিশ্ব এই সংকটকে ভুলে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
খলিলুর রহমানের একটি বিশেষ সুবিধা আছে। তিনি বহু বছর জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা ও পদ্ধতি তিনি জানেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের পক্ষে কাজে লাগতে পারে। তবে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেছেন। রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশাবাদী বক্তব্য দিয়েছে। বাংলাদেশের নেতারাও আশার কথা বলেছেন। কিন্তু এখনো প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। এর অর্থ হলো সমস্যাটি শুধু সদিচ্ছার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জটিল ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা। তাই খলিলুর রহমানের কাছ থেকে অলৌকিক কিছু আশা করা ঠিক হবে না। বরং দেখা উচিত তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারেন। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কতটা জীবন্ত রাখতে পারেন। নতুন অর্থায়ন আনতে পারেন কি না। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারেন কি না। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তার সভাপতিত্ব শুরু হবে। তখন বিশ্বের বড় বড় নেতা নিউইয়র্কে সমবেত হবেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জলবায়ু, উন্নয়ন, যুদ্ধ ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হবে। সেই অধিবেশনে সভাপতির আসনে বসবেন একজন বাংলাদেশি। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন কূটনীতিকের সাফল্য শুধু পদ দিয়ে মাপা যায় না। মাপা হয় তার প্রভাব দিয়ে। মাপা হয় তার অর্জন দিয়ে। খলিলুর রহমানের সামনে এখন সেই সুযোগ এসেছে। তিনি যদি রোহিঙ্গা সংকটকে আবার বিশ্ব বিবেকের সামনে তুলে ধরতে পারেন, যদি বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় অবদান। বাংলাদেশের মানুষ এখন সেটিই দেখতে চায়। গর্বের পাশাপাশি তাদের প্রত্যাশাও সেখানেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









