সবুজ ঘাসের বুকে এক জাদুকর যখন বল পায়ে ছোটেন, তখন মানচিত্রের সীমানা ভুলে গোটা পৃথিবী এক বিন্দুতে এসে মেলায়। বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ জয়ের সেই মেিহন্দ্রে বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে যে আনন্দ-উল্লাস নেমেছিল, তা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা দলীয় সংকীর্ণতার ফ্রেমে বাঁধা ছিল না। দলমত নির্বিশেষে একজন খাঁটি গুণী মানুষকে ভালোবাসার এই বৈশ্বিক ও জাতীয় দৃষ্টান্ত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে হৃদয়ের ক্যানভাসকে বড় করতে হয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, "মহৎ আশয় যার, সেই তো মহৎ"-মেসির জীবনের প্রতিটি বাঁক যেন এই বাণীরই এক মূর্ত প্রতীক, যা থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক কিছু শেখার আছে।
আমাদের যাপিত জীবনে চারপাশের দিকে তাকালে প্রায়ই দেখা যায় আমরা অন্যের ভালোটুকু দেখতে বড্ড কুণ্ঠাবোধ করি। অথচ দূর ল্যাটিন আমেরিকার এক যুবকের পায়ের জাদু আমাদের শিখিয়েছে সংকীর্ণ মানসিকতার দেয়াল ভেঙে কীভাবে এক উদার আকাশের নিচে দাঁড়াতে হয়। শীর্ষস্থানীয় গুণী মানুষের কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল থাকে না, কোনো নির্দিষ্ট দল থাকে না; তারা হন সর্বজনীন। আমাদের সমাজেও যদি আমরা এই উদার মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
জাতীয় জীবনের অন্যতম বড় ব্যাধি হলো সব কিছুকে কোনো না কোনো দলীয় চশমায় দেখার প্রবণতা। মেসি যখন মাঠে খেলেন, তখন তিনি কেবল আলবিসেলেস্তেরা বা বার্সেলোনার থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন আপামর ফুটবলপ্রেমীর আরাধ্য ঈশ্বর। এই দলীয় ঊর্ধ্বের চেতনা আমাদের জাতীয় রাজনীতি ও সমাজনীতিতে ভীষণ প্রয়োজন। গুণী মানুষকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর খাঁচায় বন্দি না করে, তার প্রতিভাকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
যোগ্য মানুষের যোগ্য স্থানে বসতে না পারা কিংবা যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া আমাদের এক বড় মনস্তাত্ত্বিক দৈন্য। মেসি তার ছোটখাটো গড়ন আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে আজ বিশ্বসেরা হয়েছেন, কারণ তার যোগ্যতা অবমূল্যায়িত হয়নি। আমাদের সমাজেও যেন কোনো কুঁড়ি ফোটার আগেই ঝরে না যায়, সেজন্য মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তোষামোদি সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে কেবল গুণ দেখেই গুণের আদর করতে হবে।
কাজের স্বীকৃতি একজন মানুষকে তার কর্মক্ষেত্রে আরও দশ গুণ বেশি দায়বদ্ধ করে তোলে। মেসিকে যখন গোটা বিশ্ব কুর্নিশ জানায়, তখন প্রকারান্তরে সেটি কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতারই স্বীকৃতি। আমাদের দেশেও তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যারা নীরবে দেশ গঠন করে যাচ্ছেন, তাদের কাজের সঠিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে সঠিক কাজের তালিটুকু না দিলে সমাজ থেকে একদিন ভালো কাজ করার মানুষগুলো হারিয়ে যাবে।
একবিংশ শতাব্দীর এই কোলাহলময় পৃথিবীতে ব্যক্তিত্ব ধরে রাখা মস্ত বড় এক সাধনা। আকাশচুম্বী খ্যাতি অর্জনের পরও মেসির সেই চিরচেনা বিনয় ও সৌম্য ভাবগাম্ভীর্য আমাদের এক অদ্ভুত পাঠ দেয়। অহংকার মানুষের পতন ঘটায়, আর বিনয় মানুষকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। আমাদের জাতীয় জীবনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষÑসবার মধ্যেই এই চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়।
মতভেদ মানুষের সমাজে থাকবেই, কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো মনোভঙ্গে রূপ না নেয়। ফুটবলের মাঠে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সাথে মেসির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে ঠিকই, কিন্তু ম্যাচ শেষে কোলাকুলির দৃশ্যে সব হিংসা গলে জল হয়ে যায়। আমাদের জাতীয় পরিমণ্ডলেও মতভেদ পরিহার করে টেবিলের মুখোমুখি বসার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভিন্নমতকে দমন না করে তার সাথে সহাবস্থান করাই হলো সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ।
প্রতিভা সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য উপহার, আর এই প্রতিভার কদর করতে না জানা এক প্রকার জাতীয় অপরাধ। ছোটবেলায় মেসির গ্রোথ হরমোনের সমস্যার কথা জেনেও যদি তার ক্লাব তাকে ফিরিয়ে দিত, তবে বিশ্ব আজ এক জাদুকরকে হারাত। আমাদের চারপাশেও এমন অনেক সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে আছে, যাদের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। প্রতিভাকে চিনে নিয়ে তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
অন্ধত্ব মানুষকে যুক্তিহীন করে তোলে, তা সে ফুটবলের অন্ধ ভক্ত হওয়াই হোক কিংবা অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থন। মেসির প্রতি বিশ্ববাসীর যে ভালোবাসা, তা কোনো অন্ধ আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তা অর্জিত হয়েছে সুদীর্ঘকালের নিখুঁত নৈপুণ্যে। আমাদেরও জাতীয় জীবনে সব ধরনের অন্ধত্ব বর্জন করতে হবে। যুক্তিবাদী মন ও খোলা চোখ নিয়ে সত্য ও সুন্দরকে গ্রহণ করার অভ্যাস তৈরি করা আমাদের সময়ের বড় দাবি।
পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি ছাড়া একটি জাতি কখনো টেকসইভাবে উন্নত হতে পারে না। মেসি যখন সতীর্থদের নিয়ে গোল উদযাপনে মাতেন, তখন সেখানে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক অহমিকা থাকে না, থাকে একতাবদ্ধ এক আনন্দ। আমাদের সমাজেও ব্যক্তিবাদের দেয়াল ভেঙে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে। একজন অন্যজনের হাত ধরে এগিয়ে গেলেই কেবল সামষ্টিক উন্নয়ন সম্ভব।
হিংসা হলো এমন এক আগুন যা সবার আগে নিজের মনকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। অন্য ফুটবলারদের সাফল্যকে ঈর্ষা না করে মেসি যেভাবে নিজের খেলায় মগ্ন থেকেছেন, তা আমাদের জন্য পরম শিক্ষণীয়। আমাদের সমাজেও অন্যের ভালো দেখে পরশ্রীকাতরতায় ভোগার যে প্রবণতা, তা দূর করতে হবে। হিংসা দূরীকরণ কেবল সমাজকে শান্তই করে না, বরং নিজের ভেতরের সৃজনশীলতাকে জাগ্রত করে।
সম্প্রীতি রক্ষা হলো একটি বহুত্ববাদী সমাজের মেরুদণ্ড। কাতার বিশ্বকাপের মাঠে আমরা দেখেছি বিভিন্ন দেশ, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ কীভাবে এক হয়ে মেসির জন্য গলা ফাটিয়েছে। বাংলাদেশও চিরকাল সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য চারণভূমি। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে বৈচিত্র্যকে উদযাপন করতে হবে এবং সম্প্রীতির সুতোকে আরও শক্ত করতে হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রে যার যা প্রাপ্য সম্মান, তাকে সেই মর্যাদা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। মেসিকে তার দেশ কিংবা ক্লাব যেভাবে রাজার আসনে বসিয়েছে, তা তাদের সংস্কৃতিরই পরিচয় দেয়। আমাদের দেশেও গুণীজন, শিক্ষক, শিল্পী ও বিজ্ঞানীদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। গুণীর কদর না করলে যে গুণী জন্মায় নাÑএই চিরন্তন সত্যটি আমাদের সদাসর্বদা মনে রাখতে হবে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য একজন সঠিক আইডল বা আদর্শ খুঁজে পাওয়া বর্তমান সময়ে বেশ কঠিন। মেসির কঠোর পরিশ্রম, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং শৃঙ্খলিত জীবনযাপন হতে পারে আমাদের তরুণদের জন্য এক চমৎকার অনুপ্রেরণা গ্রহণ। জীবনের সুদীর্ঘ খরা কাটিয়ে কীভাবে ধৈর্যের সাথে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে জয়ী হওয়া যায়, সেই গল্পই আমাদের যুবসমাজকে উজ্জীবিত করতে পারে।
কথায় আছে, মানুষের আসল পরিচয় তার চরিত্রে। খেলার মাঠের বাইরে মেসির পারিবারিক জীবন, স্ক্যান্ডালহীন ক্যারিয়ার এবং দাতব্য কাজ তার চরিত্রের উচ্চতা প্রকাশ করে। কবি আল মাহমুদ যেমন বলেছিলেন, "বড় হওয়া মানে তো আর মেঘের কাছে যাওয়া নয়"Ñতেমনি মেসির এই চারিত্রিক সৌন্দর্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও মাটির কাছাকাছি থাকাটাই আসল মহত্ত্ব।
সব ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা নেমে আসে। ফুটবল মাঠে যেমন রেফারি কিংবা 'ভার' প্রযুক্তির মাধ্যমে ন্যায়ের বিচার সুনিশ্চিত করা হয়, তেমনি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা দরকার। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই যেন সমান বিচার পায়, তা নিশ্চিত করলেই কেবল একটি শান্তিময় সমাজ গঠন সম্ভব।
শ্রেণীবৈষম্যহীন মনোভাব একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত। রাজপ্রাসাদের রাজপুত্র থেকে শুরু করে বস্তির হতদরিদ্র শিশুটিÑসবাই মেসির পায়ে বল দেখলে সমানভাবে হেসে ওঠে। বিনোদন বা আনন্দ যেমন কোনো শ্রেণীভেদ মানে না, তেমনি রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাও যেন কোনো দেয়াল না তোলে। সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন দরকার।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মানুষের একটি মহৎ গুণ যা সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। মেসি তার জীবনের প্রতিটি বড় অর্জনে তার পরিবার, সতীর্থ এবং ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি। আমাদের জাতীয় জীবনেও যারা দেশের জন্য অবদান রাখছেন বা রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। পূর্বসূরিদের কাজের ঋণ স্বীকার করাই উত্তরসূরিদের সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। নেতিবাচকতা, পরনিন্দা আর হতাশার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে আমাদের সুন্দরকে উদযাপনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। একজন বিদেশী খেলোয়াড়ের জয় দেখে যদি আমরা আপ্লুত হতে পারি, তবে নিজের দেশের মানুষের যেকোনো ছোট সাফল্যকেও বড় করে দেখার মনস্তত্ত্ব আমাদের নিজেদের ভেতরেই লালন করতে হবে।
সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে আদান-প্রদান আর গ্রহণের মাধ্যমে। মেসির ফুটবল শৈলী যেমন বিশ্বজুড়ে এক নতুন নান্দনিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, তেমনি আমাদেরও নিজস্ব শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে হবে। সংস্কৃতির এই সুস্থ ধারা যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে পারে এবং একটি রুচিশীল ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সব বিভেদ ভুলে আমাদের এখন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার সময় এসেছে। মেসির প্রতি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, মানবতা আর গুণের জয় সর্বত্র। আমাদের রাজনীতি ও সমাজ থেকেও 'ট্যাগ রাজনীতি' বা কাদা ছোঁড়াছুড়ির অপসংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। আসুন, একজন ফুটবল জাদুকরের জীবন থেকে পাওয়া এই আলোটুকু নিজেদের মজ্জায় ধারণ করি; সব সংকীর্ণতা ভুলে একটি সুন্দর, সহনশীল ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









