বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যকার বর্তমান সীমান্ত উত্তেজনা এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক এই ত্রিমুখী চাপ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা নিচে কয়েকটি প্রধান পয়েন্টে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. সীমান্ত উত্তেজনার বর্তমান প্রেক্ষাপট
মিয়ানমার সীমান্ত ও আরাকান সংকটঃ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (বিশেষ করে আরাকান আর্মি) মধ্যকার তুমুল লড়াইয়ের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে। জান্তা বাহিনীর পরাজয় এবং আরাকান আর্মির সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ফলে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে:
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত: ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নিরাপদ প্রত্যাবাসন আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও সংঘাত: মাঝেমধ্যেই মিয়ানমার থেকে মর্টার শেল বা গোলা এসে বাংলাদেশের ভেতরে পড়ছে, যা সীমান্ত সুরক্ষাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার ও মাদক চোরাচালানের (যেমন ইয়াবা ও আইস) চেষ্টা সীমান্ত অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
২. ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জঃ সীমান্তের এই ভূরাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পা বাড়াতে হবে: ক) ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিঃ অতীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিল বলে যে সমালোচনা ছিল, ভবিষ্যতে তা থেকে বের হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে হবে।
ভারত ও চীন নীতি : তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন বা কারিগরি সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভারতের সাথে ট্রানজিট, বিদ্যুৎ এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কোনো ব্লকে না গিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব : তুরস্ক বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে, যা একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
খ) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বর্ডার ম্যানেজমেন্টের আধুনিকায়নঃ মিয়ানমার সীমান্তে জান্তা বাহিনীর ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সনাতন সীমান্ত পাহারা দিয়ে ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ড্রোন এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমে সমৃদ্ধ করতে হবে। টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
গ) ব্লু ইকোনমি ও বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিঃ মিয়ানমার ও ভারত উভয়েরই নজর বঙ্গোপসাগরের ওপর। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট এবং বন্দরগুলোর (যেমন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর) নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হবে। এই অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের শক্তি বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
৩. ভবিষ্যতের ইতিবাচক সম্ভাবনাঃ সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি বড় অর্থনৈতিক হাব বা কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ দেয়:
আঞ্চলিক সংযোগ : বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থ বজায় রেখে ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে ট্রানজিট ও বাণিজ্য সুবিধা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ট্রানজিট করিডোর হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সংস্কার : ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে দেশে যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক নীতিমালার পরিবর্তন এসেছিল, তা যদি সফল হয়-তবে বৈদেশিক বিনিয়োগ (ঋউও) আকর্ষণে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম বা ভারতের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
তাই বলতে হচ্ছে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আর কোনো আঞ্চলিক শক্তির “একতরফা বাধ্যগত অংশীদার” হিসেবে নয়, বরং নিজের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সীমান্তে কঠোর ও আপসহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আর এজন্য সর্বপ্রথম রোহিঙ্গা বিষয়ক সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা জানি, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সীমান্ত সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। দুই দেশের মধ্যে মাত্র ২৭১ কিলোমিটারের (স্থল ও নদী মিলিয়ে) সংক্ষিপ্ত সীমান্ত থাকলেও, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং জাতিগত নিধনযজ্ঞের কারণে এই সীমান্তটি এখন বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ। এই দ্বন্দ্ব ও সংকটের প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. রোহিঙ্গা সমস্যা সংকটের মূল উৎসঃ রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি শরণার্থী সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর একটি স্থায়ী ও বিশাল বোঝা।
উদ্বাস্তু স্রোত : ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম ও পরিকল্পিত জাতিগত নিধনের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
এর আগের শরণার্থীদের মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
প্রত্যাবাসন স্থবিরতা : গত কয়েক বছরে একাধিকবার দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক (চীনের মধ্যস্থতায়) আলোচনা হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার জান্তা সরকারের অনীহা এবং রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধ এর প্রধান কারণ।
২. মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও সীমান্ত উত্তেজনাঃ মিয়ানমারের ভেতরে জান্তা বাহিনী (সামরিক সরকার) এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর-বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের শক্তিশালী বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি (অঅ)-এর মধ্যকার তুমুল লড়াই সরাসরি বাংলাদেশ সীমান্তে এসে আছড়ে পড়ছে।
সীমান্তে গোলাবর্ষণ ও আকাশসীমা লঙ্ঘন : বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছিটকে আসা মর্টার শেল ও ভারী গোলার আঘাতে একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গা নিহত ও আহত হয়েছেন। মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান ও ড্রোন একাধিকবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, যার প্রেক্ষিতে ঢাকা তীব্র কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মিয়ানমার বাহিনীর অনুপ্রবেশ ও আত্মসমর্পণ: জান্তা বাহিনীর একের পর এক ক্যাম্প আরাকান আর্মি দখল করে নেওয়ায়, প্রাণভয়ে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিবিপি) এবং সেনাবাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বাংলাদেশ তাদের জাহাজে করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠায়।
সেন্ট মার্টিন ও নাফ নদী সংকট: নাফ নদীতে চলমান সংঘাতের কারণে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে বাংলাদেশি ট্রলার ও জাহাজে মিয়ানমারের দিক থেকে (কখনও জান্তা বাহিনী, কখনও আরাকান আর্মি দ্বারা) গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এর ফলে সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দারা মাঝেমধ্যেই খাদ্য ও যাতায়াত সংকটে পড়েন।
৩. অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিঃ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতি এবং অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলে বেশ কিছু মারাত্মক ঝুঁকির জন্ম দিয়েছে:
ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র গোষ্ঠী: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন আরসা বা আরএসও) এবং মাদক চক্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত সহিংসতা, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান : নাফ নদী ও দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ‘ইয়াবা’ এবং ‘আইস’ (ক্রিস্টাল মেথ)-এর মতো মারাত্মক মাদকের চালান আসছে। এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র।
ভূপ্রাকৃতিক বিপর্যয় : উখিয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর বনভূমি কেটে ক্যাম্প তৈরি করায় ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পাহাড় ধস ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট তৈরি করছে।
৪. সমুদ্রসীমা বিরোধ : স্থল সীমান্ত নিয়ে তীব্র উত্তেজনা থাকলেও, দুই দেশের মধ্যে একটি বড় ইতিবাচক অর্জন হলো সমুদ্রসীমা বিরোধের স্থায়ী সমাধান। বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নিকটবর্তী জলসীমা এবং একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল-এর রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই মামলায় জয়লাভ করে এবং বঙ্গোপসাগরে নিজের ন্যায্য হিস্যা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তাই পরিশেষে বলা চলে, বাংলাদেশ সব সময়ই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও বর্তমান বাস্তবতায় পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছে যে, স্থায়ী প্রত্যাবাসন ছাড়া এই সংকটের কোনো বিকল্প নেই। তবে রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীকে হটিয়ে আরাকান আর্মি যেভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তাতে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে কেবল জান্তা সরকারের ওপর নির্ভর না করে আরাকান আর্মির মতো অ-রাষ্ট্রীয় অংশীজনদের সাথেও কৌশলী কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হতে পারে।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









