মানুষকে মানুষ বলার ভিত্তি কী? দুটি হাত, দুটি পা, একটি মুখ, কিছু ভাষা আর কিছু বুদ্ধি; এতেই কি মানুষ হওয়া সম্পূর্ণ হয়? নাকি মানুষের পরিচয় তার শরীরে নয়, তার চেতনায়? প্রশ্নটি নতুন নয়। তবু প্রতিটি সময়ে, প্রতিটি সমাজে, নতুন করে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষ কি বাড়ছে?
এই প্রশ্নটি আমাকে বহুদিন ধরে তাড়া করে বেড়ায়। ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে; যেখানেই মানুষের ভিড় দেখি, সেখানেই মানুষের খোঁজ করি। কারণ মানুষ দেখতে পাই, কিন্তু মানুষকে খুঁজে পাই না। অনেক বছর আগে এই অনুভূতি থেকেই দুটি লাইন লিখেছিলাম;
মানুষ আর অমানুষে তফাৎটা এই
মানুষের বোধ আছে অমানুষের নেই।
আজ আর মনে নেই, কোন ঘটনার অভিঘাতে এই পংক্তি দুটি লিখেছিলাম। কিন্তু এটুকু মনে আছে, কোনো এক সময় মানুষের আচরণ আমাকে গভীরভাবে আহত করেছিল। তখন উপলব্ধি হয়েছিল, মানুষের শরীর পাওয়া সহজ; কিন্তু মানুষের বোধ অর্জন করা কঠিন। আমি নিজেও নিজেকে প্রশ্ন করি; আসলেই কি আমি মানুষ? সকল সময় কি আমার বোধের উন্মোচন হয়? আমিও কি অমানুষের আচরণ করি না? জানিনা কিছুই, আমার বিচার তো আমি করতে পারবো না!
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ তার মেধার বিস্ময়কর প্রমাণ রেখে চলেছে। মহাকাশে অভিযান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, যোগাযোগের বিপ্লব; সবই মানুষের অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, এই অগ্রগতির সমান্তরালে কি মানুষের বিবেকও সমানভাবে বিকশিত হয়েছে? আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি, আমার বিবেক তো সেভাবে বিকশিত হয়নি।
প্রযুক্তি আমাদের গতি দিয়েছে, কিন্তু গন্তব্য দেয়নি। তথ্যের পাহাড় গড়েছে, কিন্তু প্রজ্ঞার নদী তৈরি করতে পারেনি। মানুষকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু মানবিক করেছে, এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় না। আজকাল মানবিকতার ভাষণ শোনা যায় খুব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই মানবতার আহ্বান, ন্যায়বিচারের দাবি, সমতার কথা। সভা-সেমিনারে, আলোচনায়, বক্তৃতায়; মানবতার জয়গান। কিন্তু জীবনের আয়নায় যখন সেই মানুষগুলোর আচরণ দেখি, তখন প্রায়ই অন্য একটি মুখ ভেসে ওঠে। কথায় মানবতা, কাজে নির্মমতা; মুখে ন্যায়ের বুলি, ব্যবহারে অন্যায়ের প্রশ্রয়। তখন মনে হয়, মানবিকতা আজ অনেকের কাছে একটি উচ্চারণ; কিন্তু জীবনচর্চা নয়।
আসলে মানুষের পরিচয় বক্তৃতায় নয়, ব্যবহারেই প্রকাশ পায়। একজন মানুষ তার অধীনস্থ কর্মচারীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, গৃহকর্মীকে কতটা সম্মান দেন, মতের ভিন্নতা মেনে নিতে পারেন কি না, ক্ষমতা হাতে পেলে কতটা সংযত থাকেন; এসবই তার প্রকৃত পরিচয়ের মানদণ্ড। কারণ মানুষকে চিনতে হলে তার কথার চেয়ে আচরণ পড়তে হয়।
সমস্যা হলো, আমরা এখন মানুষকে মূল্যায়ন করি তার সম্পদ, পদ, প্রভাব কিংবা অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে। অথচ সভ্যতার ইতিহাস বলে, মানুষের মর্যাদা কখনোই এসব দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। ইতিহাস যাদের স্মরণ করে, তারা অধিকাংশই ক্ষমতার জন্য নয়; মানবতার জন্য স্মরণীয়।মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বোধ। এই বোধই তাকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে।
ক্ষুধা, ভয়, রাগ, আকাঙ্ক্ষা; এসব প্রাণীরও আছে। কিন্তু নিজের প্রবৃত্তিকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা, অন্যের কষ্ট অনুভব করার সামর্থ্য, নিজের ভুল স্বীকার করার সততা, এসবই মানুষের বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু আজ সেই বোধের জায়গায় প্রায়ই বসে যাচ্ছে স্বার্থ। সম্পর্কের জায়গায় সুবিধা, ভালোবাসার জায়গায় হিসাব, বিবেকের জায়গায় লাভ-লোকসান। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে যন্ত্রের মতো দক্ষ হচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের দিক থেকে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। ংআমার সবচেয়ে বেশি বিস্ময় জাগে তখন, যখন দেখি কেউ মানবতার সবচেয়ে জোরালো বক্তা, অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সেই মানবিকতার সামান্য চিহ্নও নেই। যারা অন্যের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলেন, কখনো কখনো তারাই অন্যের সম্মান কেড়ে নিতে দ্বিধা করেন না।
তখন বুঝি, মানবিকতা মুখে ধারণ করার বিষয় নয়; এটি চরিত্রে ধারণ করার বিষয়।
অথচ সমাজের নিভৃত কোণেও কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম আমরা জানি না। তারা কোনো মঞ্চে ওঠেন না, সংবাদপত্রের শিরোনাম হন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত নন। কিন্তু বিপদে তারা নীরবে মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিদানের আশা করেন না, প্রচারেরও প্রয়োজন বোধ করেন না। তাদের দেখে মনে হয়, মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো কখনো প্রচারের মঞ্চে নয়; মানুষের নীরব কর্মে জ্বলে।
তাহলে পরিপূর্ণ মানুষ কাকে বলব? সম্ভবত পরিপূর্ণ মানুষ বলে কেউ নেই। কারণ ভুল মানুষেরই ধর্ম। কিন্তু পরিপূর্ণতার দিকে যাত্রা করা মানুষ অবশ্যই আছে। যে প্রতিদিন নিজের ভেতরের অন্ধকারকে একটু একটু করে সরিয়ে দেন, নিজের ভুলের সঙ্গে লড়াই করেন, অন্যকে ছোট করার বদলে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করেন; তিনিই প্রকৃত মানুষ হওয়ার পথে হাঁটছেন।
মানুষ হওয়া কোনো জন্মগত সম্মান নয়; এটি অর্জনের বিষয়। প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে, প্রতিদিনের আচরণে, প্রতিদিনের আত্মসমালোচনায় মানুষ নিজেকে মানুষ বানায়। তাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সনদে লেখা থাকে না; লেখা থাকে তার চরিত্রে।
আজ পৃথিবীতে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। অভাব নেই বিত্তবান মানুষেরও। কিন্তু যে মানুষ অন্যের চোখের জল মুছে দিতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে পারে, ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়কে বড় মনে করে, প্রতিশোধের বদলে ক্ষমাকে বেছে নেয়, সেই মানুষই ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। তাই আজও আমি মানুষ খুঁজি। এমন মানুষ, যার পরিচয় তার পদবি নয়; তার ব্যবহার। যার সম্পদ তার ব্যাংক হিসাব নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতা। যার শক্তি তার ক্ষমতা নয়; তার বিবেক।
'নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাতে হয়। অন্যে সেটা বাজালে ফাটিয়ে ফেলতে পারে।' কথাটা এ কারণে বললাম ; আমার নিজে লেখা এই ছোট্ট ছড়াটি আমাকে প্রায় সময়ই পথ দেখায়। বিরক্তিতে কিংবা আনন্দতেও আমি আওড়াই-
মানুষ আর অমানুষে তফাৎটা এই
মানুষের বোধ আছে অমানুষের নেই
আজ মনে হয়, এই দুটি পংক্তির মধ্যে মানুষের সমগ্র দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জ্ঞানে নয়, তার বোধে। কারণ জ্ঞান মানুষকে বড় করতে পারে, কিন্তু বোধ মানুষকে মহৎ করে।সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, অর্থনৈতিক বৈষম্যও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো প্রকৃত মানুষের সংকট।
মানুষে মানুষে ভরা এই পৃথিবীতে তাই আজও আমি মানুষ খুঁজি; এমন মানুষ, যার উপস্থিতিতে অন্য মানুষ নিরাপদ বোধ করে; যার কথায় নয়, কাজে মানবতার পরিচয় মেলে; যার জীবন দেখে আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, মানুষ এখনও আছে। আর যতদিন এই বিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে না যায়, ততদিন আমার অনুসন্ধানও শেষ হবে না। মানুষের ভিড়ে আমি মানুষ খুঁজেই যাব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









