প্রতি বছরই কমে টাকার মান। মুদ্রার মান কমে যাওয়া মানে হলে কোন পণ্য কিনতে গেলে আগের চেয়ে বেশী টাকা দিতে হয়। তার মানে হলো মুল্য স্ফিতি ঘটে । আসলে মুল্য স্ফিতি কি ? মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যেখানে সময়ের সাথে সাথে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম ক্রমাগত বাড়ে এবং এর ফলে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে অনেকগুলো জিনিস কেনা যেত, এখন সেই একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য বা সেবা পাওয়া যায়। মূল্যস্ফীতি কৃষকের শ্রমের ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলে।
এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি তাদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হন। তাছাড়া মুদ্রাস্ফিতির সাথে সাথে শ্রমের মজুরী বেড়ে যায় , ফলে বেড়ে য্য়া কৃষি শ্রমিকদের মজুরিও । বাংলাদেশে মুল্যস্ফিতির উত্থানের জন্য যে সমস্ত পণ্যের দাম আড়ে তা আর কমে না , কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত পণ্য উঠা নামা করে মুল মুদ্রাস্ফিতির প্রভাব তাতে পড়ে না। যেমন ২০০০ সালে পটলের দাম ছিল কেজি প্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা, বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ।
পটলের দাম গড়ে বাড়ল বাড়ল কেজি প্রতি ৫০ শতাংশ। গ্রামের হাটে ২০০০ সালে এই পটল বিক্রি হত ১০ থেকে ১৫ টাকায় এখন ১২-১৫ টাকার বেশী বিক্রি হচ্ছে না। প্রকৃতার্থে একজন উৎপাদনকারী কৃষকের দাম বাড়ল ২৫-৩০ শতাংশে। এভাবে প্রতিটি কৃষি পণ্যের দাম বিবেচনা নিয়ে হিসাব করলে দেখা যায় গত ২৬ বছরে গড়ে কৃষ্যি পণ্যের মুল উৎপাদনকারী কৃষকের কাছে তার উৎপাদিত পণ্যের দাম ২০ শতাংশের বেশী বৃদ্ধি পায়নি। ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম খুচরা বাজারে ৯ থেকে ১০ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার খুচরা বাজারে ৩০ থেকে ৩২ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
সারের মুল্য বৃদ্ধি পেল প্রায় আড়াই গুন। অন্য দিকে ২০০০ সালে একজন কৃষি শ্রমিকের মুজরী ছিল গড়ে ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করে । বর্তমানে একজন কৃষি শ্রমিকের মজুরী দাড়িয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা করে।বর্তমানে ধান কাটার সময় একজন শ্রমিকের গড়ে মজুরী ৫৫০ টাকা করে দিতে হয়। কৃষিতে উৎপাদক উপকরণ গুলোর দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না উৎপাদিত পণ্য গুলোর দাম। মুদ্রাস্ফিতির করাল থাবার কষাঘাতে পড়ছে প্রান্তিক কৃষকরা। এ বছরের আমের নায্যমুল্য কৃষক পায়নি । এক মন আমের উৎপাদন খরচ হিসাব করলে কৃষকের ভাগ্যে জুটেছে ছিটা ফোটা লাভ।
কারণ এক কেজি ল্যাংড়া আমের উৎপাদন খরচ পড়ে ৩২ টাকা আর এই ল্যাংড়া আম বিক্রি করতে হয়েছে ২৯ টাকা কেজি । প্রতি কেজিতে লোকসান ৩ টাকা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে উদ্ভাবিত আম ব্যানানা মাঙ্গো, বারি ফোর , আম্রপালিতে কেজিতে ১৮- ৪০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়েছে উৎপাদনকারীর। এই লাভজনক আম গুলো প্রান্তিক চাষীরা চাষ করতে পারে না। এই আম গুলো চাষ করছেন পুজি ওয়ালা বড় বড় ব্যবসায়ীরা, তারা শত শত বিঘা জমি লীজ নিয়ে অধিক মুলধন খাটিয়ে লাভ করে নিচ্ছেন, এরা যে বিপুল পরিমানে মুলধন বিনিয়োগ করেন তা একজন প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সম্ভব না।
তাই আম চাষে প্রান্তিক কৃষকরা এদের সাথে টিকে থাকাটা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। ফলে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন লোকসানের মুখে। প্রাচীনকাল থেকেই দেশের কৃষি খাত টিকিয়ে রেখেছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। বড় পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। গত ১১ বছরে বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারের হার অর্ধেকে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। বাংলাদেশ কৃষি কাউন্সিলের তথ্য থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি-নির্ভর। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সংগে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের মোট জিডিপির শতকরা ২০ ভাগ কৃষিখাত হতে অর্জিত হয় এবং সমগ্র শ্রমশক্তির ৪৮ শতাংশ কর্মসংস্থান এ খাতের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
অথচ এই খাতকে সরকারী ভাবে উপেক্ষা করা হয়। কারণ বিগত বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের বিগত পাঁচ অর্থ বছরের বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটের আকার হল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এই আকার থেকে কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২৮,৮৮১ কোটি টাকা (শুধুমাত্র কৃষি মন্ত্রণালয়), ২০২৫-২৬ বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ হয়েছে ২৭,২২৪ কোটি টাকা (মূল বরাদ্দ) ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬,২৫৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল । ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার আকারের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৬,২৫৪ কোটি টাকা।
দিনের পর দিন বাজেটে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা হ্রাস পাচ্ছে। ২০১১-১২ সালে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে তা ৬ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পায়। এবার তা নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে। এর কারণ, যে হারে মোট বাজেট বাড়ছে, সে হারে কৃষি খাতের বাজেট বাড়ছে না।
এবার মূল বাজেট বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জিডিপিতে বৃহত্তর কৃষি খাতের শরিকানা এখনো প্রায় ১২ শতাংশ। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আমরা পুরোপুরি নির্ভরশীল কৃষি খাতের ওপর। সে কারণে মোট বাজেটে কৃষি খাতের শরিকানা ন্যূনপক্ষে এর মোট অবদানের সমানুপাতিক হওয়া উচিত। এই বাজেট গুলো বলে দেয় দেশের প্রান্তিক শ্রমশক্তি কিভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। এই উপেক্ষার কারণে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা । সুতরাং দেশে এই বৃহৎ জনসম্পদকে দক্ষ ভাবে গড়ে তুলতে না পাড়লে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিই একটা সময় এসে মুখ থুবরে পড়বে।
লেখক: কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









