২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। এর মধ্যে সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী ছিল। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে ফেল করেছে ৬ লাখ ৬৬০ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৭১৬ জন ছাত্র এবং ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪৪ ছাত্রী। ছেলেদের ফেলের হার বেশী।
শিক্ষা বোর্ড অনুসারে পাসের হার, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড : ৭১.৬৩%, যশোর শিক্ষা বোর্ড : ৬৬.২৭%, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড : ৬৫.৪২% রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড: ৬৩.৬৭% , বরিশাল শিক্ষা বোর্ড: ৬০.৩৫%, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড: ৫৯.৪৮%, সিলেট শিক্ষা বোর্ড: ৫৮.৩৩%, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ৫৮.০৫%, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড : ৫৭.৩৯%, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড : ৫৮.২০% , মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (দাখিল): ৫৫.৪৯% । নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক কর্মরত।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ জন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। এই প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ জন ছাত্রী ও ৯ জন ছাত্র ছিল। কোন ছাত্রছাত্রীই পাস করতে পারেনি। শতভাগ ফেলের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা। শিক্ষকদের অবহেলা এবং প্রতিষ্ঠানের নাজুক শিক্ষা কার্যক্রমকে এ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন তারা।
যশোহর জেলার শার্শা উপজেলার সাড়াতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯ জন শিক্ষক মাত্র চারজন পরীক্ষার্থীকে পড়িয়েও কাউকেই পাস করাতে পারেননি। প্রধান শিক্ষিকা এর জন্য শিক্ষক সংকটকে এর জন্য দায়ী করেছেন। এ ছাড়া শতভাগ ফেল করা বারোপোতা সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসায় ১২ জন শিক্ষক ১৭ জন শিক্ষার্থীকে এবং ঘিবা দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ৯ জন শিক্ষক ২৩ জন শিক্ষার্থীকে পড়িয়েও একজনকেও পাস করাতে পারেননি। ২০২৬ সালের ফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক বিভাগের বিপর্যয়। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগের পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
বিপরীতে বিজ্ঞানে ৮০ দশমিক ৬৪ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। এর একটি বড় কারণ গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা। ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী বোর্ড ভিত্তিক শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হলো, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড (সম্মিলিত) ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ২২৬টি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ২৯টি , বিদেশের পরীক্ষা কেন্দ্র ১টিসহ সর্বমোট ৩১২টি।
এই ৩৩২টিতে রয়েছে শতভাগ ফেল করা শিক্ষার্থী। ফলাফল খারাপ হওয়ার মূল কারণ হিসাবে যা বলা হচ্ছে তা হলো, ১. ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মৌলিক ধারণার অভাব ও নিয়মিত অনুশীলনের ঘাটতি। ২. না বুঝে শুধু গাইড বা নোট মুখস্থ করা, যার ফলে একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে না পারা। ৩. পড়াশোনায় সময় ঠিক মতো ভাগ না করা এবং পরীক্ষার হলে সময়মতো খাতা শেষ করতে না পারা। ৪. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা নার্ভাসনেসের কারণে জানা জিনিসও ভুলে যাওয়া বা ভুল করা। ৫. নিয়মিত পড়াশোনা না করে পরীক্ষার আগে হঠাৎ পড়ার চাপ নেওয়া বা ক্র্যামিং করা।
আরেকটি বিষয় এখনে লক্ষ্যণীয় যে , এবারের এসএসসি বা সমমান পরীক্ষঅয় ফলাফল বিপর্যয়ের সমুল বিষয় হলো দুটি , একটি গণিত অন্যটি ইংরেজী । মাধ্যমিক স্তরে ভাল ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। যদিও বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) নামে বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বাছাই ও নিয়োগের সুপারিশ করার একটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থা কতৃক সম্প্রতি কিছু শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে। এরা আগের শিক্ষকদের চাইতে অধিকতর যোগ্য বলে প্রমানও রাখছে।
কারণ আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠারে গর্ভনিং বডি কতৃক নিয়োগ প্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন । ইংরেজী ও গণিত বিষয়ে পাঠদান দেয়ার মত যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব রয়েছে উপজেলাস্তর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে। তাই দেখা যাচ্ছে যে, গ্রামাঞ্চলে শতভাগ ফেল করার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশী। তাছাড়া দেশের মাধ্যমিক স্তরের মাদ্রাসার শিক্ষকদের জ্ঞানগত বিষয় নিয়ে চলে নানা রকম হাসি ঠাট্টা। বগুড়ার কামারচট্ট বাঠাতন নেছা আলিম মাদ্রাসার সুপারেনটেন্ট আব্দুল জলিল এবারের দাখিল (এস এস সির সমমান) পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার ৫০ বছরের কর্মজীবনের এটি এই মাদ্রাসার সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। এখানে প্রশ্ন হলে জলিল সাহেব কত বছর বয়সে এই মাদ্রাসায় কর্মজীবন শুরু করেন। আমরা জানি ৫৯ বছর বয়সে একজন শিক্ষক অবসরে যান।
একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের কি ৫০ বছর কর্ম জীবন থাকে ? এখানে ষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাদের সেন্স অব হিউমার কতটুক আছে। আর এ ধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকরা কি রকম পাঠ দান করতে পারবেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। সুতরাং এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের জন্য মুলত শিক্ষকরাই দায়ী। অনেকেই মনে করছেন , বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রশাসন চালান কঠোর ভাবে তাই এই ফলাফল বিপর্যয়। এটা আসলে ঠিক না , কারণ খাতায় যদি শিক্ষার্থীরা লিখে থাকেন , শিক্ষা মন্ত্রীর কঠোরতায় কি ফলাফলের বিপর্যয় আনবে ?
দেশের গ্রামাঞ্চলের ৮০ ভাগ শিক্ষকরাই ভালোভাবে ইংরেজী বুঝেন না। তাছাড়া দক্ষ গণিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। রাজধানীসহ দেশের শহরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ফলাফল সন্তোষজনক। এর ক্রেডিট কি শিক্ষকদের? না কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য শহরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো হয়নি। রাজধানীসহ দেশের শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল করার পেছনে রয়েছে কোচিং সেন্টার। কারণ রাজধানীসহ সহ দেশের বড় বড় শহর গুলোতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার। এই সেন্টার গুলোতে কোচিং নিয়ে ভালো ফলফল করছে শহরের শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে গ্রামাঞ্চলে এ রকম কোচিং সেন্টার নাই। তাই গ্রামের শিক্ষার্থীরা ফলাফল খারাপ করছে ।
পরীক্ষার ফল ভালো করতে হলে যা করার প্রয়োজন তা হলো , ১. নোট বা গাইডের ওপর নির্ভর না করে মূল পাঠ্যবই বা টেক্সট বুক লাইন ধরে পড়তে হবে। ২. মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়গুলো গভীরভাবে বুঝে পড়ার অভ্যাস করতে হবে। ৩. প্রতিদিনের পড়াশোনার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি বা রুটিন তৈরি করে তা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।৪.এই বিষয়গুলোতে সাধারণত শিক্ষার্থীরা বেশি দুর্বল থাকে। তাই এগুলোর নিয়মিত চর্চা করতে হবে। ৫. প্রতিটি অধ্যায় ভালো করে পড়ে ছোট প্রশ্নের প্রস্তুতি নিতে হবে। ৬. সিলেবাস শেষ হওয়ার পর আগের বছরের বোর্ড প্রশ্ন ও বিভিন্ন স্কুলের টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান করতে হবে। ৭. সময় ধরে নিজে নিজে পরীক্ষা দিলে লেখার গতি ও ভীতি দুটোই দূর হয়। ৮. যা পড়া হবে, তা সপ্তাহে অন্তত একবার রিভিশন বা পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
উল্লেখিত বিষয়ের গাইড হিসাবে শিক্ষকরাই দায়িত্ব পালস করতে পারেন। শিক্ষকদের কর্তব্য নিষ্ঠাই ফলাফল বিপর্যয় রোধ করতে পারবে।
লেখক : কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









