গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যাত্রাপথ কখনোই কোনো মসৃণ বা সমতল পথরেখা ধরে প্রবাহিত হয় না। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর বিখ্যাত ‘পলিমোরফিক পলিটিক্স’ ও ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক সামাজিক ও সাংবিধানিক সংগঠন যা মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে অস্তিত্ব লাভ করে এবং কেবল ন্যায়পরায়ণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের হাতেই তার পরম প্রকাশ ঘটে’।
একটি টেকসই ও কার্যকর গণতন্ত্রে তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জন করতে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যাঁরা নিজেদের উৎসর্গ করেন, তাঁদের রাষ্ট্র পরিচালনায় আসীন হওয়াটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম। অতীতে পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মতো জনসম্পৃক্ত ও ভিত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে ধাপে ধাপে জনসেবা ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পার হয়ে জাতীয় রাজনীতি এবং পরিশেষে রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ সাংবিধানিক আসনে পৌঁছানোর নজির বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক।
স্থানীয় প্রশাসনের সমস্যা, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং মানুষের সুখে-দুঃখে সরাসরি পাশে থাকার মধ্য দিয়েই একজন প্রকৃত জননেতা নিখাদ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা অর্জন করতে সক্ষম হন। তৃণমূলের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে বৃহত্তর পরিসরে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণের মেলবন্ধন ঘটাতে সেতু হিসেবে কাজ করে।
২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাবেক মহাসচিব ও প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদ ভবনে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রধান নির্ধারণের এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা নয়, বরং তা রাজপথের সংগ্রাম, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জামায়াত-ই-ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান বীর বিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, যিনি পেয়েছেন ৮৮ ভোট। জাতীয় সংসদের মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন সাংসদ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সরাসরি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ বঙ্গভবনে আসীন হওয়ার এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথপরিক্রমায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অতি প্রাচীনকাল থেকেই প্রজ্ঞার সঙ্গে বলা হয়েছে- ‘কষ্টে মেলে রত্ন, যদি কর যত্ন’। ন্যায্যতা ও আদর্শের রাজপথে ত্যাগের মহিমায় রাজনৈতিক জীবনকে যিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, আজ জাতির সংকটকালে দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবকত্বে তাঁর এই অধিষ্ঠান সত্যিই কালজয়ী প্রতিফলন।
রাজনৈতিক পথপরিক্রমা কেবল বিজয়ের তোরণ দিয়ে সজ্জিত থাকে না, সেখানে থাকে অসংখ্য রক্তচক্ষু, বিনাবিচারে কারাবাস এবং নির্যাতনের দীর্ঘ ও করুণ ইতিহাস। একজন শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী থেকে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার পথটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজনীতিতে এসে তিনি কেবল নীতি-আদর্শের জায়গায় আপসহীন ছিলেন না, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলকে সুসংগঠিত রাখতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে অন্তত ১১ বার কারাবরণ করতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ বছরেরও বেশি সময় বন্দিজীবন এবং মুখোমুখি হতে হয়েছে শতাধিক মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলার।
আরবি ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত কালজয়ী প্রবাদ রয়েছে- ‘আস-সাবরু মিফতাহুল ফারাজ’ অর্থাৎ ধৈর্য ও সহনশীলতাই সকল সংকট উত্তরণের মূল চাবিকাঠি। একইভাবে রোমান প্রখ্যাত দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তক সেনেকা তাঁর ‘ডি প্রভিডেনশিয়া’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘ঝড়-ঝঞ্ঝা ও প্রতিকূলতা ব্যতিরেকে বীরের প্রকৃত পরিচয়ের স্ফুরণ ঘটে না; প্রতিকূল পরিবেশই মানুষের ভেতরের সংকল্প ও আসল চরিত্র ফুটিয়ে তোলে’। মির্জা ফখরুলের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও ত্যাগের ইতিহাস প্রমাণ করে, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞা কেবল কোনো ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং রাষ্ট্রনায়কসুলভ যোগ্যতার অন্যতম প্রধান মৌলিক শর্ত। পূর্বে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর দেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমনই এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন, ঠিক ৩৫ বছর পর ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক ভোট পুনরায় প্রমাণ করল, একটি পরিপক্ক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলশক্তিই হলো সার্বিক ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার উন্মুক্ত চর্চা।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আসা অভূতপূর্ব অভিবাদন ও অভিনন্দন বার্তা ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রা আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিশনগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের হাই কমিশন এবং চীনা দূতাবাসের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত অর্থবহ ও সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিখ্যাত পণ্ডিত হ্যান্স মোর্গেনথাউ তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স অ্যামং ন্যাশনস’-এ লিখেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনীতিতে দেশের জাতীয় স্বার্থই হলো সর্বোচ্চ চালিকাশক্তি, আর সেই স্বার্থ ও মর্যাদা বিশ্বদরবারে বজায় রাখতে প্রয়োজন দক্ষ, মার্জিত ও সর্বজনগ্রাহ্য সাংবিধানিক নেতৃত্ব’। নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি বিশ্বশক্তির এই উষ্ণ অভিনন্দন বার্তা প্রমাণ করে, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, কূটনীতিনিপুণ ও উদারপন্থী রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বহুগুণে উজ্জ্বল করবে।
বাংলাদেশের গণপ্রজাতন্ত্রী সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং তিনি দেশের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ এবং ১২৩(২) অনুচ্ছেদের বিধিসমূহ প্রতিপালন করে শূন্য পদে রাষ্ট্রপতির এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান সিইসি এ. এম. এম. নাসির উদ্দিনের যোগ্য পরিচালনায় যেভাবে একটি স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর পরিবেশে আইনপ্রণেতারা তাঁদের গোপন ব্যালট প্রদান করেছেন, তা সংসদীয় গণতন্ত্রচর্চায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা জানি, জনগণ যখন তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তখন সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান পবিত্র দায়িত্ব দাঁড়ায় ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জেনারেল উইল-এর পরিপূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি কেবল একটি অলংকারিক পদ নয়, বরং তিনি জাতীয় ঐক্য, সংবিধান রক্ষা এবং দেশের অখণ্ডতার পরম প্রতীক।
একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও চিরন্তন প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে- ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ অথবা ‘একতায় উত্থান, বিভেদে পতন’। ফ্যাসিবাদী শক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাটন করতে এই মুহূর্তে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন গণতান্ত্রিক ও সংগ্রামী যোদ্ধার বিকল্প নেই। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রাষ্ট্রকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে হলে আবার জাতীয় ঐক্যেরও কোনো বিকল্প নেই। একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বভাবজাত বিনয়, ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞান তাঁকে দলমত নির্বিশেষে সর্বজনগ্রাহ্য এক অভিভাবকের অবস্থানে উন্নীত করেছে। বিশিষ্ট ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ হ্যারল্ড লাস্কি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ গ্রামার অব পলিটিক্স’-এ লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রের প্রকৃত সফলতা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের ওপর এককভাবে নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা এবং সামগ্রিক জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষমতার ওপর’।
রাষ্ট্রপতি পদে নতুন দায়িত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। ফলে, বঙ্গভবনে প্রবেশের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হতে পারে রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষত নিরাময়ে নৈতিক ও সাংবিধানিক নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করা। রাষ্ট্রপতির প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁর আচরণে যদি সমতার বার্তা প্রতিফলিত হয়, তবে তা জনগণের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নাগরিকের অধিকার সীমিত হবে না, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে না এবং যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নগুলোও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বঙ্গভবনের একজন অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও নৈতিক নেতৃত্ব, সাংবিধানিক ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরো পরিণত হতে পারে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঞ্চালনায় ও পরিচালনায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন, যা কেবল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরম প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হয়নি; বরং তা হয়েছে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক শুভ সূচনা। প্রচলিত আছে, ‘যদি বর্ষে পৌষে, টাকা আসে কষে’। অর্থাৎ, সঠিক সময়ে প্রকৃতি যেমন বৃষ্টির মাধ্যমে কৃষকের মুখে হাসি ফোটায় এবং সমৃদ্ধি আনে, ঠিক তেমনই সঠিক সময়ে একজন ধীরস্থির, অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের আগমন রাষ্ট্রের জাতীয় জীবনে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সাম্যের বার্তা বয়ে আনে। স্থানীয় সরকার বা পৌরসভার মতো মাঠপর্যায়ের প্রশাসন এবং রাজপথের লড়াই-সংগ্রামের ধুলাবালি মেখে, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হয়ে যিনি আজ বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ অলিন্দে প্রবেশ করছেন, তাঁর ওপর দেশের আঠারো কোটি মানুষের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। নতুন দিনের বাংলাদেশ গঠনে, সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষায় এবং বিশ্ব দরবারে দেশকে একটি মর্যাদাশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো ব্যক্তিকে শুধু তাঁর পদ দিয়ে মূল্যায়ন করে না; মূল্যায়ন করে তাঁর সময়ে রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ, গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী এবং সাধারণ মানুষ কতটা মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পেরেছে- তার ভিত্তিতে। বঙ্গভবনের দরজা দিয়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। রাজপথের অকুতোভয় যোদ্ধা যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হন, তখন তাঁর অতীতের সংগ্রাম হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের দায়িত্ব পালনের পাথেয়। এখন সময় প্রমাণ করবে- দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষকসুলভ ধৈর্য, সংকটে অবিচল থাকার মানসিকতা এবং রাষ্ট্রচিন্তার প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি কতটা মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। যদি তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হয়, মতের ভিন্নতা সহনশীলতার সংস্কৃতিতে রূপ নেয় এবং নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, তবে তাঁর বঙ্গভবনে প্রবেশ শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাবেক প্রভাষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









