প্রতিদিন গণমাধ্যমে সংবাদ হচ্ছে খুন, সংঘাত, মারামারি, দখল, মব-সন্ত্রাসের মতো ঘটনা। এই সব ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। দেশের নতুন প্রজন্মের কিছু তরুণের কর্মকাণ্ড দেখে মানুষ হতবাক। অথচ এই তরুণদের নেতৃত্ব সংগঠিত হয়েছিল, ব্রিটিশ তাড়ানো সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভুত্থান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২৪-এর বৈষমনিরোধ আন্দোলন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই, সমাজের সাধারণ মানুষকে এখন থাকতে হয় তরুণদের মব-সন্ত্রাসের ভয়ে। কারণ, তরুণদের সাথে কোনো বিষয় নিয়ে চুন থেকে পান খসলে ঘটে যায় ভয়াবহ সহিংস ঘটনা। তাই দেশের তারুণ্যের একটা অংশই এখন সমাজের মহা আতঙ্কের নাম।
২৬ সেটেম্বর সন্ধ্যার পর রাজশাহীর চন্ডিপুর এলাকায় কয়েকজন যুবক টাকা ভাঙাতে আবদুল বারীর নামের দোকানির কাছে যায়। বারী তাদেরকে জানায় ক্যাশে ভাঙতি টাকা নেই। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আবদুল বারীর কথা-কাটাকাটি ও একপর্যায়ে হাতাহাতি হয়। এর জের ধরে রাত পৌনে ২টার দিকে ৫০ থেকে ৫৫ জনের মতো তরুণ দেশীয় অস্ত্র ও পেট্রোল বোমা নিয়ে আবদুল বারীর বাড়ির সামনে আসে। প্রথমে তারা তার মুদি দোকানের শাটারের তালা ভেঙে ভেতরে পেট্রোল বোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দোকানে আগুন দেখে আবদুল বারী ও তার পরিবারের সদস্যরা বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। এ সময় হামলাকারীরা আবদুল বারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে।
এক পর্যায়ে তাকে মৃত ভেবে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্বজনরা গুরুতর আহত আবদুল বারীকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) দিবাগত মধ্যরাতে মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মীরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালায়। তারা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে হাত-পা বেঁধে ফেলে, মারধর করে। ভারী এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা (ইপিআই ভ্যাকসিন), আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ ও নগদ টাকাসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। জানা যায়, ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের স্বল্প আয়ের মানুষ, গর্ভবতী মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। বিগত ৫০ বছর ধরে এটি সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করছিল।
ঢাকার কল্যাণপুর পোড়াবস্তি এলাকায় দোকান ও বসতঘর দখল, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হামলার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এরপরও ভোগান্তি কমেনি ভুক্তভোগীদের। উল্টো ক্ষমতাসীন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এখনো চলছে চাঁদাবাজি ও দখলদারি। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা চেয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার চাঁদাবাজি-দখলদারি-হামলার অন্তত ১৫টি ঘটনার তথ্য দিয়েছে দৈনিক ডেইলি স্টার, যা নিয়ে গত ১১ মে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর গত ১৬ মে ও ২০ মে আরো দুই দফায় লাঞ্ছিত হতে হয়েছে ভুক্তভোগীদের।
চলতি ২০২৬ সালে সারা বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনার সুনির্দিষ্ট সামগ্রিক সংখ্যা পুলিশ সদর দপ্তর প্রকাশ না করলেও, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক ডাটাবেজ এবং মামলার পরিসংখ্যান থেকে যে আংশিক চিত্র গণমাধ্যম পেয়েছে তা থেকে জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তে এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশ ঘটনার সত্যতা মিলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই ৬ মাসে সারাদেশে ছোট-বড় বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় প্রায় ১ লাখ মামলা রেজিস্টার্ড হয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে মারামারি, দখলবাজি, সহিংসতা ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা।
ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৈরি করা অভ্যন্তরীণ তালিকায় রাজধানীতে ১,৫৩০ জন চাঁদাবাজ ও দখলদারের নাম এসেছে, যার মধ্যে ১৪৮ জনকে সরাসরি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সারাদেশে অনেক চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসের ঘটনা লোকলজ্জা বা আতঙ্কের কারণে মামলা পর্যন্ত গড়ায় না, যার ফলে মোট প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা নথিভুক্ত মামলার সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি । তাছাড়া সারদেশে বাড়ছে খুন, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধ। শুধুমাত্র দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অজ্ঞাত বা পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা, যা নথিভুক্ত হত্যা, খুন, সন্ত্রাসের বাইরে। এই অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার প্রতিনিয়ত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন থেকে চার বছর ধরে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ক্রমাগত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৭টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। সম্প্রতি রাজধানীতে চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস অপরাধের মাত্রা বহুগুণ বাড়ার চিত্র দেখা গেছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবর এলাকায় একটি ট্রাভেল ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় বিচ্ছিন্ন মাথা ও দুই হাত। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী খাল থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে ৫০০টিরও বেশি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুসারে, বছরের প্রথম আট মাসেই (জানুয়ারি-আগস্ট) নদী, রাস্তা, রেললাইন ও মাঠ থেকে ৪৬৫টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত না হলে পুলিশ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের হিসাব অনুসারে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট ২,১০৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। তার মধ্যে ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫০০টি, আরো বাকি আছে তিন মাস। সারা দেশে কেন বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা- তা ভেবে দেখা দরকার।
সামাজিক অস্থিরতা, চাঁদাবাজি এবং খুন-খারাবি বৃদ্ধির পেছনে মূলত আইনশৃঙ্খলার শিথিলতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকট দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো- ১. রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকার পতনের পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়া এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কারণে অনেক এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল ও তৎপরতা কমে গেছে। ২. অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা নতুন অপরাধ সংঘটনে তাদের উৎসাহিত করছে।
৩. দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শূন্যস্থান পূরণ করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্থানীয় গ্রুপ এলাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। ৪. পরিবহন সেক্টর, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগের সিন্ডিকেট হটিয়ে নতুন সিন্ডিকেট বা দলের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় চাঁদাবাজি ও সংঘর্ষ বাড়ছে।
৫. সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও অপরাধীরা সহজেই অস্ত্র ব্যবহার করছে, যার ফলে খুন-খারাবির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৬. সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা কমে গেছে। ৭. অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পাওয়ার কারণে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় কাজ করছে না। ৮. নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, যা অনেককে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ৯. কর্মসংস্থানের অভাব এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার কারণে যুবসমাজের একটি অংশ সহজে টাকা আয়ের পথ হিসেবে গ্যাং কালচার ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছে।
এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত পুলিশ প্রশাসনকে পুরোপুরি কার্যকর করা, যৌথবাহিনীর নিয়মিত অভিযান জোরদার করা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
লেখক : কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









