একসময় বাংলাদেশের হজের কোটা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। সেই কোটা পূরণ হয়নি। ২০২৪ সালে প্রায় ৪২ হাজার আসন অব্যবহৃত ছিল; ২০২৫ সালেও খালি ছিল ৪৩ হাজার ৬৭১টি আসন। অথচ এবার কোটা কমে ৭৮ হাজার ৫০০-তে নেমে আসার পর সেই আসনও প্রায় পূর্ণ। বরং নির্ধারিত কোটার বাইরে আরও ২০ হাজারের বেশি মানুষ হজ পালনের সুযোগের পেক্ষায়। বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় এর চেয়ে বড় বৈপরীত্য আর কী হতে পারে?
এই বৈপরীত্যকে নিছক ভাগ্যের পরিহাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর মধ্যে গত কয়েক বছরের হজ ব্যবস্থাপনা, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং হজের ব্যয় কাঠামোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। বড় কোটা থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ তা পূরণ করতে পারেনি—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। হজের ব্যয় যে সাধারণ মানুষের জন্য বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করে হজ পালন অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে তুলনামূলক কম খরচে ওমরাহ পালনের সুযোগ থাকায় কেউ কেউ সেটিকে বেছে নিয়েছেন।
মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যও আগের মতো নেই। ফলে সৌদি আরব বড় কোটা দিলেই যে বাংলাদেশ তা পূরণ করতে পারবে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু এবার দৃশ্যপট পাল্টেছে। ৭৮ হাজার ৫০০ আসনের বিপরীতে বিপুল নিবন্ধন প্রমাণ করছে, হজের চাহিদা একেবারে কমে যায়নি। বরং সামর্থ্য, সময়, পরিস্থিতি ও প্রত্যাশার সমন্বয়ে বহু মানুষ এবার হজ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিমানভাড়া কমানো এবং প্যাকেজের কাঠামোয় পরিবর্তনও আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা অনেক মানুষ এবার সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইছেন—এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখন প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত চাহিদার দায় কে নেবে? হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটা চেয়েছে। সরকারও জানিয়েছে, চূড়ান্ত নিবন্ধনের পর প্রয়োজন হলে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কারণ যারা ইতিমধ্যে হজ পালনের প্রস্তুতি নিয়েছেন, তাঁদের অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দীর্ঘসূত্রতা করা সমীচীন নয়। তবে আরও বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতির জন্য কি আমরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম? গত দুই বছরে বড় কোটা খালি থাকার পর এবার কোটা কমে গেলে সম্ভাব্য চাহিদা নিয়ে কি যথেষ্ট পূর্বাভাস ও বিশ্লেষণ করা হয়েছিল? হজের নিবন্ধন, কোটা নির্ধারণ ও চাহিদা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যদি নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা থাকে, তাহলে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হওয়ার কথা।
এখানে সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ যখন ধারাবাহিকভাবে বড় কোটা পূরণ করতে পারেনি, তখন ভবিষ্যৎ কোটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই শুধু অতিরিক্ত কোটা চাইলেই হবে না; বাংলাদেশের প্রকৃত হজ চাহিদার একটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র সৌদি কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরাও জরুরি। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—অতিরিক্ত কোটা পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের আগে অপেক্ষমাণ হজযাত্রীদের মধ্যে যেন কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া, নিশ্চিততার ইঙ্গিত দেওয়া কিংবা অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়। হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এবারের ঘটনা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে: হজের কোটা শুধু সংখ্যা নয়, এটি চাহিদা, সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের বিষয়। বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করা যায়নি—এ বাস্তবতা যেমন মনে রাখতে হবে, তেমনি কম কোটা পেয়ে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ার নতুন বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না।
অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তবসম্মত হজ নীতি তৈরি করা। মানুষের সামর্থ্য, হজের প্রকৃত ব্যয়, নিবন্ধনের প্রবণতা এবং সম্ভাব্য চাহিদা—সবকিছুর সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে আগাম পরিকল্পনা করতে হবে।
কারণ এবার ২০ হাজার মানুষের অপেক্ষা হয়তো সাময়িক একটি সংকট। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তার উত্তর খুঁজতে না পারলে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় একই অনিশ্চয়তা বারবার ফিরে আসবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









