একটি শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় তার মা-বাবা। হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটতে শেখার আগে যে হাতটি তাকে ধরে রাখে, কথা বলতে শেখার আগে যে কণ্ঠটি তাকে সাহস দেয়, পৃথিবীকে চিনতে শেখার আগে যে দুজন মানুষ তার পৃথিবী হয়ে ওঠেন তাঁরা হলেন মা-বাবা। সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে তাঁরা নিজেদের কত স্বপ্ন, কত ইচ্ছা, কত প্রয়োজন সবকিছু নীরবে বিসর্জন দেন, তার হিসাব করতে গেলে হিসাবের খাতা ফুরিয়ে যাবে, তবুও শেষ হবে না।
সন্তানকে একটু ভালো স্কুল, ভালো পোশাক, ভালো খাবার কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য মা-বাবা নিজেদের আরাম-আয়েশ ভুলে যান। সন্তান অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকেন, একটু ফুলের টোকাও যেন গায়ে না লাগে তা নিয়েই দিবানিশি ভাবেন, তেমনি সন্তানের সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান তাঁরাই। সাধারণত সেই সন্তান যখন বড় হয়ে নিজের জীবন, কর্মব্যস্ততা ও সাফল্যের দৌড়ে এগিয়ে যায়, তখন মা-বাবাকে আগলে রাখবে এমনটাই স্বাভাবিক কিন্তু কখনো কখনো এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেই মানুষ দুজনই হয়ে পড়েন সবচেয়ে একাকী, অবহেলিত।
আমাদের সমাজে নিষ্ঠুর বাস্তবতার এমন উদাহরণ অহরহ। একজন মা তাঁর সন্তানদের বড় করেছেন। কেউ হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, কেউ শিক্ষকতা করছেন। জীবনের সবটুকু সঞ্চিত শ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসা দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন তিনি। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু হলো নিজের ঘরে। খবর পাওয়া গেল মৃত্যুর কয়েক দিন পর।
২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিকে ঢাকার পল্লবীর একটি বাসা থেকে প্রায় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামে এক মায়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের বাসার একটি কক্ষে একাকী বসবাস করছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘরটি আবর্জনায় ভরা ছিল এবং দেহে পচন ধরেছিল।
পুলিশ জানিয়েছিল, মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর চার সন্তানের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের অধ্যাপক, একজন কানাডাপ্রবাসী এবং একজন স্কুল শিক্ষক এমন তথ্যও সংবাদে এসেছে। ঘটনাটি একটি উদ্বেগজনক প্রশ্ন সামনে এনে দেয় সন্তানের সাফল্য যদি বাবা-মায়ের শেষ বয়সের একাকিত্ব দূর করতে না পারে, তবে সেই সাফল্যের পূর্ণতা কোথায়।
প্রশ্নটি আরো গভীর হয় যখন এমন নিস্তব্ধ ঘটনা ক্রমে ঘটেই চলছে। তার মধ্যে সম্প্রতি দেশের অন্য প্রান্ত থেকে আসা আরেকটি খবরে যা ফুটে ওঠে। অক্টোবর ২০২৬-এ বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০ জন প্রবীণ নারী-পুরুষ বসবাস করছেন। তাঁদের একজন রুমা বেগম যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া একজন নারী। জীবনে তিনি এক সময় মেধা ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁর ঠিকানা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম। সেখানে থাকা আরেক বৃদ্ধা মা অঞ্জলী রানীর চাওয়াটিও খুব বেশি নয়, তিনি চান সন্তানরা এসে পাশে কিছুক্ষণ বসুক, দুটো কথা বলুক।
উপরের দুটি ঘটনা হয়ত একই ধাচের নয় এবং প্রত্যেক পরিবারের বাস্তবতা আলাদা, প্রত্যেক বৃদ্ধ মানুষের বৃদ্ধাশ্রমে আসার কারণও এক নয়। কিন্তু দুটো ঘটনাই আমাদের একটি বড় সামাজিক সমস্যা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনে একাকিত্ব অবহেলার পেছনে একটি মাত্র কারণ কাজ করে না; সেই সাথে সময়ের সঙ্গে পরিবারের কাঠামো, জীবনযাপনের ধরন ও সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এক সময় আমাদের সমাজে যৌথ পরিবার ছিল অনেক বেশি প্রচলিত। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী প্রবণতা এবং বিদেশে পাড়ি জমানোসহ বিভিন্ন কারণে পরিবারগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মজীবনের ব্যস্ততা। সন্তানদের জীবনে চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা, নিজের সংসার ও নানা সামাজিক দায়িত্ব বাড়ছে। অনেক সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাঁদের চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া কিংবা একটু সময় নিয়ে পাশে বসার মতো বিষয়গুলোও অবহেলিত হয়ে পড়ে। দূরত্ব তখন শুধু শহর বা দেশের নয়, ধীরে ধীরে তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। জীবনের শেষভাগে অনেক প্রবীণের নিজের পর্যাপ্ত আয় বা সঞ্চয় থাকে না। আবার সন্তানদেরও অনেক সময় সীমিত আয় দিয়ে নিজের পরিবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হয়। ফলে, পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হতে পারে চাপ ও দ্বন্দ্ব। আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রজন্মগত দূরত্ব। প্রযুক্তি ও জীবনযাপনের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে প্রবীণ বাবা-মা অনেক সময় নিজেদের সন্তানদের জীবনধারা ও চিন্তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কখনো কখনো বাবা-মাকে পরিবারের একজন সদস্যের পরিবর্তে সন্তানের কাছে যখন ‘বোঝা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়; তখন তাঁদের মতামত, আবেগ ও প্রয়োজন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়।
সমস্যাটি শুধু একাকিত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অবহেলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তাঁদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর। দীর্ঘদিন একাকিত্বে থাকলে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, অসহায়ত্ব ও আত্ম-মর্যাদাবোধের সংকট তৈরি হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজনও বাড়ে। তখন পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে একজন প্রবীণের স্বাভাবিক জীবন আরো কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অবহেলার কারণে তাঁদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কারণ, যাঁরা এক সময় সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাকে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ যখন সন্তানের কাছে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন সেই কষ্ট শুধু শারীরিক নয়; গভীরভাবে মানসিকও।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকিত্ব কিংবা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা কমাতে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা। বাবা-মায়ের যত্নকে আর্থিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, সময় দেওয়া, চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকা- এসব মা-বাবার প্রতি সন্তানের দয়া নয় বরং সন্তানের অবশ্য করণীয় দায়িত্বের অংশ। তবে, শুধু সন্তানের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অনেক প্রবীণ আছেন যাঁদের সন্তান নেই, সন্তান থেকেও পাশে থাকার সুযোগ নেই, তাঁদের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। বয়স্ক ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তার পরিধি আরো কার্যকর ও সহজলভ্য করা দরকার।
প্রবীণদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। তবে বৃদ্ধাশ্রমকে যেন কোনোভাবেই শুধু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঠিকানা হিসেবে দেখা না হয়। এছাড়া আমাদের সমাজে যে সকল আধুনিক বৃদ্ধ নিবাসে চিকিৎসা, বিনোদন, মানসিক সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ থাকা উচিত। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে প্রবীণদের জন্য দিবাযত্নকেন্দ্র, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, সামাজিক মিলনকেন্দ্র এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে অনেক প্রবীণকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না করেই প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব ও সম্মানবোধ তৈরির জন্য সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে তরুণরা নিয়মিত প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটালে তাঁদের একাকিত্ব যেমন কমবে, তেমনি তরুণ প্রজন্মও জীবনের অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারবে। সবশেষে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়াকে যেন কখনোই বোঝা হিসেবে না দেখে কৃতজ্ঞতা ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কারণ, তাঁরা সন্তানকে বড় করতে গিয়ে স্বার্থহীনভাবে সন্তানের জন্য কাজ করে গেছেন।
সমাধান তাই শুধু বৃদ্ধাশ্রম কমিয়ে দেওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন প্রবীণকে নিরাপদ থাকার জন্য বৃদ্ধাশ্রমে যেতে বাধ্য হতে হবে না এবং যেখানে তিনি পরিত্যক্ত মানুষ কিংবা সমাজের বোঝা হিসেবে বিবেচিত হবে না বরং পূর্ণ মর্যাদার একজন নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করতে পারবেন। কারণ, শেষ বয়সে একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ত খুব বেশি কিছু নয়- নিরাপত্তা, সম্মান, একটু সময়, একটু ভালোবাসা এবং আপনজনের পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
লেখক: কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









