বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটেছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ নামক একটি বিশেষ বক্তব্যের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের মানুষের মনে গভীর আশার সঞ্চার করেছিল ব্যাপকভাবে। এ সময় এসে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় জীবনে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এই পরিকল্পনার মাঝে একটি সুন্দর সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, এখন দেশজুড়ে নতুন আলোচনারও জন্ম হয়েছে।
বাংলাদেশের জনসাধারণের বড় অংশের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। যদিও এই পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ রূপটি এখনও বিস্তারিতভাবে সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। তথাপি এই অপ্রকাশিত রূপটিই জনগণের মাঝে এক ধরনের কৌতূহল ও আশাবাদ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। দেশের জনতার বড় অংশ বিশ্বাস করেছিল, এই গোপনীয়তার মাঝে দেশের সার্বিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক বিশাল রূপরেখা নিশ্চিতভাবে নিহিত রয়েছে।
একটি পরিকল্পনার আভাস পাওয়ামাত্রই সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর মানসিক তৃপ্তি অনুভূত হচ্ছিল। নাগরিক সমাজ মনে করছিল তাদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সমস্যার সমাধান হতে চলেছে। এই বক্তব্য জনমনে সীমাহীন আশার সঞ্চার করেছিল। প্রতিটি নাগরিক একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখছিল। এই মানসিক প্রশান্তি মানুষকে নতুন করে বাঁচার এবং দেশের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছিল প্রতিনিয়ত।
এই ঘোষণা তরুণ প্রজন্মের মাঝেও এক বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। দেশের যুবসমাজ তখন নতুন উদ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিল। জাতীয় অগ্রগতির এই যাত্রায় শামিল হতে সবাই তখন উদগ্রীব ছিল। একটি পরিকল্পনার অস্তিত্ব রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল অত্যন্ত গভীরভাবে সর্বস্তরে।
উন্নয়নের ওই নতুন বার্তা জনমনে এক মধুর অনুভূতি সৃষ্টি করছিল। প্রতিটি পরিবার তখন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছিল। এই বক্তব্যের মাঝে যে অসীম অপ্রকাশিত আশা লুকিয়ে ছিল তা মানুষকে দিনবদলের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। পরিবর্তনের এই সুবাতাস গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে শহরের নাগরিক জীবন পর্যন্ত সর্বত্র এক দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করছিল, যা তারা মনে করছিল যে, এই পরিকল্পনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
দেশবাসীর অন্তরে এই বক্তব্য এক পরম আত্মিক প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। নাগরিকরা তখন তাদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে নতুন করে ভাববার সাহস পাচ্ছিল। কল্পনার স্বাধীনতা মানুষকে সুন্দর এক আগামী বিনির্মাণের পথে উদ্বুদ্ধ করছিল। এই মানসিক বল দেশবাসীকে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি যুগিয়েছিল এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশান্বিত করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা কর্মক্ষেত্রে এক অফুরন্ত প্রেরণা হিসেবে কাজ করছিল বাংলাদেশে। সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরে এক নতুন কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। এটি সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে এক আনন্দময় অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছিল। দেশের অগ্রগতি যে থমকে যাবে না- এই পরিকল্পনা মানুষকে সেই বিষয়ে স্বস্তি দিচ্ছিল। এই ইতিবাচক আবহাওয়া জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে দেশের মানুষ গভীরভাবে মনে করছিল।
এই বক্তব্য সমগ্র জাতিকে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। দলমতনির্বিশেষে দেশের সাধারণ মানুষ উন্নয়নের এই উদ্যোগকে মহৎ বলে স্বাগত জানিয়েছিল। জাতীয় ঐক্যের ওই চমৎকার আবহ দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। সুন্দর আগামী গড়ার এই স্বপ্ন দেশকে বিশ্বদরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে সকলে আশা করছিল। সমৃদ্ধির এই যাত্রায় প্রতিটি নাগরিক নিজেকে অংশীদার মনে করে গর্ববোধ করেছে তখন ব্যাপকভাবে। স্বপ্নের এই স্বস্তির পাশাপাশি এ সময় এসে বাস্তবতার বিড়ম্বনাও কিন্তু কম নয়। এই ঘোষণার পর থেকে জনগণের মাঝে পর্বত পরিমাণ প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন অতি দ্রুত নগদ প্রত্যাশা পূরণের আশা করছে। কিন্তু যে কোনো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যুক্তিসঙ্গত একটা সময়ের প্রয়োজন হয়। এখন এই তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা সরকারকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ফেলেছে। ফলে, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আমাদের দেশের মানুষ স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। যে কোনো নতুন আশার বাণীতে তারা দ্রুত উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন মাটিতে যখন সেই আশার প্রতিফলন দেরিতে ঘটে তখন তারা সহজেই ধৈর্যচ্যুত হয়ে পড়ে। এই মানসিকতা যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ধৈর্যের অভাব এবং অতি উচ্ছ্বাস অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। এটি জনমনে এক ধরনের হতাশার জন্ম দেয়।
পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত না হওয়ায় সমাজে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সবাই মনে করছে এই প্ল্যানে আমার জন্য কিছু একটা আছে। প্রত্যেকেই এই পরিকল্পনাকে নিজের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ব্যাখ্যা করছে। এই অতি উচ্চ আশা পরবর্তীকালে বড় বিপত্তির কারণ হতে পারে। যখন প্রত্যাশা পূরণ হবে না, তখন জনগণের মাঝে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি থেকে যায়, যা কাম্য নয়।
জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ সামলানো সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধীদের নেতিবাচক প্রচারণা। বিরোধীরা এই পরিকল্পনার অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে জনগণের মাঝে সংশয় তৈরির চেষ্টা করছে। তারা একে কেবলই একটি রাজনৈতিক স্ট্যান্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। এই ধরনের রাজনৈতিক প্রচারণা জনমনে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
যে কোনো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো শক্তিশালী অর্থনীতি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও নানা আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির কারণে বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে পরিকল্পনাটি মাঝপথে কোনো বিপত্তির সম্মুখীন হবে কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত। আর্থিক সীমাবদ্ধতা দূর করতে না পারলে স্বপ্নের এই রূপরেখা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের সরকারি প্রশাসনে প্রায়শই আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই অনভিজ্ঞতা আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও ভেস্তে যায়। অতএব প্রাতিষ্ঠানিক অনভিজ্ঞতা দূর করা এই পরিকল্পনার সফলতার অন্যতম বড় পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সবসময়ই বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব যে কোনো ভালো পরিকল্পনার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেয় না। এই সামাজিক অনাচারগুলো দূর করা না গেলে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের সুফল কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। ফলে, সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।
আমাদের এই ছোট ভূখণ্ডে অধিক জনসংখ্যা এক বিরাট বাস্তব সমস্যা। যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল এই বিশাল জনসংখ্যার চাপে ঢাকা পড়ে যায়। অতিরিক্ত মানুষের জন্য আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানে নতুন কোনো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। জনসংখ্যার এই আধিক্য সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা যে কোনো অগ্রগতিকে ধীরগতির করে তোলে।
প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে ফলাফল না আসায় নীতিনির্ধারকদের ওপর এক তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ অনেক সময় তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়। প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই চাপকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। একটি বড় পরিকল্পনাকে সফল করতে হলে যে ধরনের শান্ত ও সুসংহত পরিবেশ প্রয়োজন, তা এই মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে নষ্ট হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান বিশ্বের জটিল ভূরাজনীতিও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। আঞ্চলিক ক্ষমতাশক্তির ভারসাম্য রক্ষা করে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কঠিন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক মন্দা আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ধরনের বাহ্যিক উপাদানগুলোর ওপর দেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না অথচ এগুলো যে কোনো জাতীয় পরিকল্পনার সফলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে সক্ষম অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে।
আমাদের দেশের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত প্রাচীন ও ধীরগতির। নতুন এবং আধুনিক কোনো পরিকল্পনাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই।
আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য যে কোনো ফাইলের গতিকে শ্লথ করে দেয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া কোনো বড় প্ল্যান বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। কিন্তু সংস্কার প্রক্রিয়া নিজেই একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত জটিল কাজ, যা সহজে সম্পন্ন হতে চায় না। সুশাসনের অভাব বাস্তবতার আরেকটি বড় বিড়ম্বনা। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যদি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা না থাকে তবে জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ঘটে। এই অপচয় ও অনিয়ম রোধ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে যে কোনো আকর্ষণীয় পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করতে পারে।
পরিশেষে কাব্যিকভাবে এ নিবন্ধের সমাপ্তি টানছি - স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলে মন চায় উড়তে নীলিমায়, বাস্তবতার কঠিন আঘাতে ভেঙে যায় আশা বেদনায়। সুদূর পিয়াসী আলো আঁধারে খোঁজে মুক্তির পথরেখা, কত শত বাধা পথ রুখে দাঁড়ায় কপালে জাগে যে একা। তবুও মানুষ আশার প্রদীপ জ্বেলে রাখে নিয়ত অন্তরে, নতুন দিনের সোনালী সূর্য আসবে কিনা জানি না এ ঘরে। স্বপ্নের সেতু ভাঙাগড়ার এই খেলায় জীবন বয়ে চলে অবিরাম।
লেখক: প্রাবন্ধিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









