বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; আধুনিক জীবনে এটি মানুষের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। একটি শিশুর পড়াশোনা, একজন রোগীর চিকিৎসা, একজন ব্যবসায়ীর জীবিকা কিংবা একটি পরিবারের নিরাপদ জীবনযাপন—সবকিছুর সঙ্গেই বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্পর্ক নিবিড়। একটি দেশের উন্নয়ন, মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। অথচ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের হাজারো মানুষ এখনো নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এটি শুধু দুঃখজনক বাস্তবতা নয়, বরং নাগরিক অধিকার, সামাজিক সমতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন। সেন্টমার্টিন ভৌগোলিকভাবে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। সমুদ্রপথে যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বীপবাসীকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। পর্যটনের কারণে দ্বীপটি দেশজুড়ে পরিচিত হলেও পর্যটনের আড়ালে সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
পর্যটকরা কয়েক দিনের জন্য সেন্টমার্টিনে গিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন; কিন্তু দ্বীপবাসীকে সেই সৌন্দর্যের মাঝেই প্রতিদিন জীবন ও জীবিকার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। তাঁদের কাছে বিদ্যুৎ কোনো পর্যটনসেবা নয়, বরং বেঁচে থাকার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ২০১৯ সালে বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেডের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বিদ্যুতের মূল্য, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও মিটার রিচার্জে অর্থ কর্তনের বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগ ও অসন্তোষ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে আলোচনা, দাবি ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন দ্বীপবাসী। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশিত স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল একটি দ্বীপে বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা কেন এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকবে, যার মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ ও মিটার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে? দ্বীপবাসীর দাবি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ছিল ২৯ টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে ৫২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণ এবং উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যয়ের প্রকৃত কাঠামো সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য থাকা জরুরি। একজন গ্রাহক হিসেবে মানুষ জানতে চাইতেই পারেন, তিনি যে বিদ্যুতের জন্য অর্থ দিচ্ছেন, তার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে।
বিদ্যুতের মূল্য যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে সেই বিদ্যুৎ সবার জন্য বাস্তব অর্থে সহজলভ্য থাকে না। সেন্টমার্টিনের মানুষের বড় একটি অংশ পর্যটন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, মাছ ধরা, দিনমজুরি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুমে কিছুটা আয় হলেও বছরের সবসময় তাঁদের আয় সমান থাকে না। ফলে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ পারিবারিক ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। অনেক পরিবারকে তখন বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করা ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু বিদ্যুতের মূল্য নয়, মিটার রিচার্জে অর্থ কর্তনের বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তাঁদের অভিযোগ, প্রতি মাসে একাধিকবার মিটার রিচার্জ করতে গেলে প্রতিবারই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ব্যবহারযোগ্য ব্যালেন্স হিসেবে প্রায় ৬০০ টাকা পাওয়া যায়; বাকি অর্থ বিভিন্ন খাতে কর্তন করা হয়। এই অভিযোগের সত্যতা এবং অর্থ কর্তনের প্রকৃত খাত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একটি নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া প্রতিটি টাকার হিসাব স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। কোনো অর্থ কর্তন করা হলে গ্রাহককে জানাতে হবে—কেন কাটা হচ্ছে, কোন নিয়মের ভিত্তিতে কাটা হচ্ছে এবং সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর মিটার ব্যবস্থায় এসব তথ্য সহজবোধ্যভাবে প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে। তাই মিটার রিচার্জের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, সময়ের দাবিও।
বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে বিপর্যস্ত জনজীবন
বিদ্যুতের মূল্য ও মিটার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সরবরাহের অনিয়ম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় দিনের বেলাতেও তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বিকেল ৪টার পর থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একটি দ্বীপে, যেখানে বিকল্প সেবা ও অবকাঠামো সীমিত, সেখানে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকার প্রভাব বহুমাত্রিক। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, ইন্টারনেট ব্যবহার, পানির পাম্প চালানো, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা খাবার সংরক্ষণ—সবকিছুই এতে বাধাগ্রস্ত হয়। পর্যটন মৌসুমে এ সংকট আরো প্রকট হতে পারে। কারণ পর্যটকদের পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতকে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে—এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকলে সেন্টমার্টিনের শিক্ষার্থীরা দেশের অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। রাতে পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার ও পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছুর জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য।
স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে, গত তিন বছরে সেন্টমার্টিনের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ৩০ শতাংশের নিচে রয়েছে। এ তথ্যের যথার্থতা এবং ফলাফলের পেছনে বিদ্যুৎ সংকট কতটা ভূমিকা রাখছে, তা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে বিদ্যুৎ সংকট যদি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বাস্তবেই বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটিকে আর কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের শিক্ষার অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। সেন্টমার্টিনে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। জরুরি রোগীকে মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হলে সমুদ্রপথ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্বীপের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য হওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিচালনা, ওষুধ সংরক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম—সবকিছুর জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য। দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকা কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নও হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যুৎ সুবিধায় বৈষম্য কেন?
বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় থাকা পরিবারের সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সেন্টমার্টিনে প্রায় ১ হাজার ২০০টির বেশি পরিবার রয়েছে। দ্বীপবাসীর দাবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে আনুমানিক ৬০০ পরিবার। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই তথ্যের প্রকৃত চিত্র সরকারি পর্যায়ে যাচাই করা জরুরি। যদি সত্যিই দ্বীপের প্রায় অর্ধেক পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই দ্বীপে বসবাসকারী একজন নাগরিক বিদ্যুৎ পাবেন, অন্যজন পাবেন না—এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বিদ্যুৎ সুবিধা যদি নির্দিষ্ট শ্রেণি, পেশা বা আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে কোনো নাগরিক যেন প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। এখানে পরিবেশের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টমার্টিন শুধু বাংলাদেশের একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি দ্বীপ। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যা দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে দ্বীপবাসীকে বিদ্যুৎবঞ্চিত রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমেই এ সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে টেকসই সমাধান
সেন্টমার্টিনের জন্য সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর সম্ভাবনা। পর্যাপ্ত সৌর প্যানেল, বৃহৎ পরিসরের ব্যাটারি সংরক্ষণ, আধুনিক মাইক্রো-গ্রিড ও প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বা আধা-স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব কি না, তা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নজরদারি। বিশ্বের বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সেন্টমার্টিনকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি আদর্শ মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। দ্বীপবাসীর দাবি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দাবি নয়।
তাঁরা চান একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যদি নির্ধারিত মান অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও সবার জন্য সমান বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি বিদ্যুতের মূল্য, সরবরাহ ও মিটার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, তাহলে সরকারি পর্যায়ে পুরো ব্যবস্থাটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সরেজমিনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয়, প্রতি ইউনিটের মূল্য, গ্রাহকসংখ্যা, মিটার রিচার্জে অর্থ কর্তনের কাঠামো, দৈনিক সরবরাহের সময় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করা দরকার। এরপর তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেন্টমার্টিনের মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই হবে।
পর্যটনের পাশাপাশি দ্বীপবাসীর জীবনমান উন্নয়ন জরুরি
সেন্টমার্টিনকে শুধু পর্যটনের চোখ দিয়ে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এই দ্বীপে মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের সন্তানরা স্কুলে যায়, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হন, তাঁদের জীবিকা আছে, তাঁদের স্বপ্ন আছে। পর্যটকদের জন্য সুন্দর একটি দ্বীপ গড়ে তোলার পাশাপাশি দ্বীপবাসীর জন্য বসবাসযোগ্য একটি দ্বীপ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পর্যটন অর্থনীতি যদি দ্বীপের মানুষের জীবনমান উন্নত করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ। সেন্টমার্টিনের বিদ্যুৎ সমস্যাকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পর্যটন ও পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বলে একটি দ্বীপের মানুষ নাগরিক সুবিধায় পিছিয়ে থাকবেন—এমন ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা দয়া চাই না, চাই ন্যায্য অধিকার। আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না, চাই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। আমরা অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাই না, চাই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ। আমরা অনিশ্চয়তা চাই না, চাই নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। আমরা বৈষম্য চাই না, চাই দ্বীপের প্রতিটি পরিবারের জন্য সমান নাগরিক সুবিধা। সেন্টমার্টিনের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে এখনই সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগে একটি টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই, বর্তমান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দ্বীপের প্রতিটি পরিবারকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার জন্য সময়বদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে না, বরং দ্বীপবাসীর জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রের কাছে দ্বীপবাসীর ন্যায্য দাবি
প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্যের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন—সেন্টমার্টিনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করুন। দ্বীপবাসীর অভিযোগগুলো শুনুন, প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করুন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
বিদ্যুতের মূল্য, মিটার রিচার্জে অর্থ কর্তন, সরবরাহের সময় ও বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় থাকা পরিবারের সংখ্যা সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন। একই সঙ্গে সরকারি উদ্যোগে একটি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
সেন্টমার্টিনের মানুষ দেশেরই নাগরিক। তাঁদের ভৌগোলিক অবস্থান তাঁদের অধিকারকে ছোট করে দিতে পারে না। সমুদ্রের ওপারে বসবাস করেন বলে তাঁদের সন্তানদের অন্ধকারে পড়াশোনা করতে হবে, অসুস্থ মানুষকে অনিশ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মধ্যে চিকিৎসা নিতে হবে কিংবা একটি পরিবারকে বিদ্যুতের জন্য আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সেন্টমার্টিনের উন্নয়ন মানে শুধু পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। আর সেই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি বিদ্যুৎ।
দ্বীপবাসীর এক দফা দাবি—সেন্টমার্টিনে সরকারি উদ্যোগে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এ দাবি কোনো অনুগ্রহের নয়, এটি একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের দাবি। এখন প্রয়োজন সেই অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের কার্যকর স্বীকৃতি। সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা এই দ্বীপের প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলুক, প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন আলোকিত হোক, প্রতিটি মানুষের জীবন হোক মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ—এটাই হোক সেন্টমার্টিনের উন্নয়নের অঙ্গীকার।
লেখক : সেন্টমার্টিন স্থায়ী বাসিন্দা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









