আমরা যখন হাতের স্মার্টফোনে এক ক্লিকেই পৃথিবীর অপর প্রান্তে থাকা কারও সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলি কিংবা মুহূর্তের মধ্যে কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্পন্ন করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, এই বিপুল তথ্যপ্রবাহ বুঝি আকাশের মেঘহীন ‘ক্লাউড’ কিংবা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক সভ্যতার এই বিস্ময়কর ডিজিটাল জগতের মূল ভিত্তি আকাশে নয়; বরং সমুদ্রের গভীর অন্ধকার তলদেশে বিস্তৃত।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছয় শতাধিক চালু সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন, বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। মানুষের চুলের ব্যাসের কাছাকাছি সূক্ষ্ম কাচের তন্তু দিয়ে তৈরি এসব ফাইবার-অপটিক কেবল সমুদ্রের হাজার হাজার কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত হয়ে কোথাও বালু ও পলির নিচে, কোথাও সমুদ্রতলের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে বহন করে চলেছে আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশের বেশি।
বিপরীতে, কৃত্রিম উপগ্রহ বৈশ্বিক যোগাযোগের তুলনামূলক ক্ষুদ্র অংশ বহন করে এবং দুর্গম অঞ্চল, প্রত্যন্ত জনপদ ও বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুতরাং, সমুদ্রের অতল গভীরে বিছানো এই অদৃশ্য প্রযুক্তিগত জাল কেবল ইন্টারনেটের বাহন নয়; এটি আধুনিক পৃথিবীর অর্থনৈতিক কার্যক্রম, তথ্যপ্রবাহ ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রাণশিরা। এর গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বিপর্যয়, আর্থিক লেনদেনে বিঘ্ন এবং ডিজিটাল সেবায় ব্যাপক অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে, আধুনিক সভ্যতার আলোকিত পর্দার আড়ালে সমুদ্রতলেই লুকিয়ে রয়েছে এক অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য জীবনরেখা।
সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত এই বিশাল তথ্য-নেটওয়ার্ক কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণের হিসাব অনুসারে, এসব সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল আর্থিক লেনদেনের দৈনিক মূল্য ১০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আপনি যখন শেয়ারবাজারের তাৎক্ষণিক সূচক পর্যবেক্ষণ করেন কিংবা কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড ডেটাবেজে কাজ করেন, তখন আপনার অজান্তেই সমুদ্রের গভীরে থাকা ফাইবার-অপটিক কেবল আলোকসংকেতের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে।
ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ডেটা সেন্টারগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই অবকাঠামোর গুরুত্ব ও নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। সে কারণে বিশ্বজুড়ে নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপন এবং বিদ্যমান নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন শুধু এই নেটওয়ার্কের গ্রাহক নয়; বরং নিজেদের বৈশ্বিক তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়াতে সাবমেরিন কেবল নির্মাণ ও পরিচালনায় সরাসরি বিনিয়োগ করছে। ফলে, সমুদ্রের গভীরে নীরবে বিস্তৃত এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এখন কেবল বৈশ্বিক যোগাযোগের ভিত্তিই নয়; বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
সমুদ্রের গভীরতা যতটা শান্ত ও রহস্যময় মনে হয়, তার তলদেশে বিস্তৃত এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ততটাই বহুমুখী ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে মানুষের অসতর্ক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক। সমুদ্রতলের ভূমিকম্প, পানির নিচে ভূমিধস, প্রবল স্রোত কিংবা ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া ভূতাত্ত্বিক ও সামুদ্রিক পরিবর্তন দীর্ঘ দূরত্বজুড়ে বিস্তৃত এই ব্যয়বহুল ফাইবার-অপটিক সংযোগের ক্ষতি করতে পারে। তবে, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের অনিচ্ছাকৃত কার্যক্রমও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক কেবল সুরক্ষা কমিটির (ICPC) পরিসংখ্যান অনুসারে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি সাবমেরিন টেলিযোগাযোগ কেবলে ত্রুটি বা ক্ষতির ঘটনা ঘটে। এর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী মানুষের অসতর্ক কার্যক্রম, বিশেষ করে, বাণিজ্যিক মাছ ধরার সরঞ্জাম ও জাহাজের নোঙর। বিশেষত অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে মাছ ধরার জাল কেবলের সংস্পর্শে আসা কিংবা জাহাজের নোঙরের কারণে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে।
তবে, এসব দৃশ্যমান ঝুঁকির বাইরেও রয়েছে আরো গভীর একটি নিরাপত্তা সংকট। সমুদ্রের হাজার হাজার কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই যোগাযোগব্যবস্থার প্রতিটি অংশে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। তদুপরি, বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসীমা, আন্তর্জাতিক জলসীমা, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তরাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের জটিলতা এই অবকাঠামোর সুরক্ষাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। ফলে, আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়েও সমুদ্রের অতল গভীরে থাকা এই ডিজিটাল ধমনিগুলো এখনো বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
আধুনিক যুদ্ধকৌশলে যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও নীরব মাত্রা, যার পরিচিতি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ হিসেবে। এই কৌশলে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভৌত অবকাঠামোর অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর অন্যতম সংবেদনশীল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল। কারণ, এসব কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে শুধু আন্তর্জাতিক যোগাযোগই ব্যাহত হয় না; বরং ব্যাংকিং লেনদেন, সরকারি ডিজিটাল সেবা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং জরুরি চিকিৎসাসেবাসহ একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দ্বীপরাষ্ট্র ও উপকূলীয় দেশ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য অল্প কয়েকটি সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ঝুঁকি আরো গভীর। বিষয়টি এখন আর নিছক প্রযুক্তিগত উদ্বেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রতলের এই কৌশলগত দুর্বলতা মোকাবিলায় ন্যাটো ২০২৩ সালে ‘ক্রিটিক্যাল আন্ডারসি ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোঅর্ডিনেশন সেল’ প্রতিষ্ঠা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তায় সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাবমেরিন কেবলসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।
এসব উদ্যোগই প্রমাণ করে, ভবিষ্যতের সংঘাতে যুদ্ধের ময়দান শুধু স্থল, আকাশ কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমুদ্রের অতল গভীরে বিস্তৃত নীরব এই তথ্যপ্রবাহও হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অন্যতম স্পর্শকাতর ক্ষেত্র। কেবল সামরিক অন্তর্ঘাত নয়, সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত এই যোগাযোগ অবকাঠামোকে ঘিরে রয়েছে বৈশ্বিক গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কাও। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই পরাশক্তিগুলো প্রতিপক্ষের সামরিক যোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
এর ঐতিহাসিক উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন আইভি বেলস’, যার মাধ্যমে সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল। তবে, সেই সময়ের তামার তারভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং বর্তমানের ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক ফাইবার-অপটিক কেবলে সরাসরি আড়িপাতা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল। এর সঙ্গে তথ্য এনক্রিপশনের ব্যবহার যুক্ত হওয়ায় গোপনে তথ্য সংগ্রহের বাধা আরো বেড়েছে। তবু তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
সমুদ্রতলের কেবলের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক কেবল অবতরণকেন্দ্র, নেটওয়ার্ক পরিচালনাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামো সাইবার অনুপ্রবেশের ঝুঁকিতে থাকতে পারে। ফলে, ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় তথ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
সমুদ্রের তলদেশে বিস্তৃত সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর কোনো একটি দেশ কিংবা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অপরিহার্য বিষয়। একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প পথে তথ্যপ্রবাহ সচল রাখা, একাধিক আন্তর্জাতিক সংযোগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কেবল মেরামতে দ্রুত সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, বাণিজ্য ও সরকারি সেবা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই অবকাঠামোর ওপর জাতীয় নির্ভরতাও বাড়ছে।
তাই সমুদ্রের তলদেশের এই নীরব জীবনরেখার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু ইন্টারনেট সচল রাখা নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, তথ্যের স্বাধীন প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ডিজিটাল নিরাপত্তা রক্ষা করা। আমরা প্রতিদিন যে ডিজিটাল পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় অনুভব করি, তার ভিত্তি যে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের সমুদ্রতলে বিস্তৃত- এই উপলব্ধিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক সভ্যতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে হলে সমুদ্রের গভীরতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









