খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা একটি দেশের বড় অর্জন। তবে, প্রকৃত খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে তা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের কৃষি গত কয়েক দশকে উন্নত জাতের বীজ, সেচসুবিধার সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ এবং গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কৃষির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ফলে, কৃষির সাফল্য এখন আর শুধু ধান, গম বা অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন দিয়ে পরিমাপ করার সুযোগ নেই। বরং উৎপাদিত খাদ্য মানুষের পুষ্টির চাহিদা কতটা পূরণ করছে, তা কতটা নিরাপদ এবং কৃষক ও ভোক্তার জন্য কতটা সাশ্রয়ী, সেটিই বিবেচনায় নিতে হবে। এ বাস্তবতায় উৎপাদননির্ভর কৃষির পরিবর্তে পুষ্টিনিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্য আয় ও পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সক্ষম কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার অগ্রগতি হলেও অপুষ্টির সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার ২০১৫ সালের ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু এখনো বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। ২০২৩ সালের হিসাবে, দেশের ২১ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষ মাঝারি এবং শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ছিল। অর্থাৎ, খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়লেও সবার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে, নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, ফলমূল ও শাকসবজির পর্যাপ্ত সংস্থান কঠিন হয়ে পড়ছে। চালনির্ভর খাদ্যাভ্যাস, সীমিত ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এর প্রধান বাধা। তাই খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু ক্ষুধা নিবারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষির উৎপাদন কাঠামোয় বহুমুখীকরণ জরুরি। ধানের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি এবং মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের উৎপাদন ও সহজলভ্যতা বাড়াতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। অঞ্চলভিত্তিক মাটি, পানি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা বিবেচনায় ফসল পরিকল্পনা, শস্যবিন্যাস ও বহুমুখী চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন, দেশীয় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ এবং গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণ জোরদার করতে হবে। এতে খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য আসবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তবে, পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতার পাশাপাশি এর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, অপরিকল্পিত সেচ, সেচের পানিতে আর্সেনিক এবং প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ঝুঁকি কমাতে উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ, মাটি ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবহার, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং উত্তম কৃষিচর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি কৃষকদের নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার ও ফসল সংগ্রহের আগে কীটনাশকের নির্ধারিত বিরতিকাল মেনে চলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় ওয়ান হেলথ বা এক স্বাস্থ্য ধারণার আলোকে খাদ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। কারণ, কৃষির লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য, কৃষকের আয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো। কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে মাটি, পানি ও পরিবেশের সুরক্ষা জরুরি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, বরেন্দ্র এলাকায় খরা এবং হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ফসল উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ এ অনিশ্চয়তা আরো বাড়াচ্ছে।
পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, মাটির জৈবপদার্থের ঘাটতি ও রাসায়নিক উপকরণের অসংযত প্রয়োগ কৃষির প্রাকৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি সাশ্রয়ী সেচপদ্ধতি, বিশেষ করে, অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং (এডব্লিউডি), বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, লবণ ও খরাসহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ, প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত না থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা টেকসই হবে না।
খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ ও বাজারের সীমাবদ্ধতায় অনেক কৃষকের জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে না। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র উৎপাদক হলেও তাঁদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। জাতীয় গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা এবং বড় উৎপাদকদের আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। শ্রম উৎপাদনশীলতার মূল্যও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ক্ষেত্রে দৈনিক ১ হাজার ৪৯৪ টাকা, যেখানে জাতীয় গড় ১ হাজার ৮৬৮ টাকা এবং বড় উৎপাদকদের ২ হাজার ৩০১ টাকা। এই বৈষম্য দূর করতে ক্ষুদ্র কৃষকদের উন্নত বীজ, কৃষিযন্ত্র, সেচ, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষিবিমা, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারী কৃষক, বর্গাচাষি ও তরুণ উদ্যোক্তাদেরও এসব সুযোগে সমান প্রবেশাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুললে তাঁদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। কারণ, কৃষকের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে কৃষিতে বিনিয়োগ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও বাড়বে না। তাই কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পুষ্টিনিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত।
কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদিত খাদ্যের অপচয় রোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ফসলের ধরন ও সংরক্ষণপদ্ধতিভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে, ফলমূল, শাকসবজি ও পচনশীল কৃষিপণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং ভোক্তাকে বেশি দামে খাদ্য কিনতে হয়। অপচয় ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে বিদ্যমান উৎপাদন থেকেই খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়বে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন ও আমদানির চাপ কমবে।
এ জন্য আধুনিক হিমাগার, শীতল পরিবহন, স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্র, মানসম্মত প্যাকেজিং ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার জরুরি। কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলাও প্রয়োজন। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাব কমিয়ে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। কারণ, খাদ্য নষ্ট হওয়ার অর্থ জমি, শ্রম, পানি, সার ও জ্বালানিতে বিনিয়োগের অপচয়। তাই খাদ্য অপচয় রোধকে উৎপাদন বৃদ্ধির সমান গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি কৃষির সাফল্য মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু হেক্টরপ্রতি ফলন বা মোট উৎপাদন নয়, উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কৃষকের নিট আয়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পরিবেশের ভারসাম্যকেও অগ্রগতির সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এ জন্য কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, কৃষি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
কৃষকদের জন্য জলবায়ু ও বাজারতথ্য, ডিজিটাল সেবা, কৃষিবিমা এবং পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্যের পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত মান ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের কৃষিকে উৎপাদনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে সমন্বিত, বহুমুখী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। কৃষির প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন প্রতিটি মানুষ পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাবে, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। এ জন্য কৃষককে শুধু খাদ্য উৎপাদক নয়, বরং খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টির বৈচিত্র্য, নিরাপদ খাদ্য, অপচয় রোধ, কৃষকের ন্যায্য আয় ও পরিবেশের ভারসাম্যকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে পারলেই কৃষির নতুন ভাবনা বাস্তব রূপ পাবে। এর সুফল উৎপাদনের পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে মানুষের সুস্বাস্থ্য, জীবনমান ও সামগ্রিক কল্যাণে প্রতিফলিত হবে।
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









