দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সাম্প্রতিক কুয়ালালামপুর সফর সত্ত্বেও পদ্ধতিগত জটিলতা ও নতুন শর্তের কারণে বাজার উন্মুক্ত হতে আরো সময় লাগবে।
যদিও মালয়েশিয়াকে দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে পদ্ধতিগত কারণে এখনই কিংবা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শ্রমবাজার খোলার সম্ভাবনা নেই। ফলে ঝুলে গিয়ে অপেক্ষা আরো বাড়ল। নিয়োগ পদ্ধতি চূড়ান্ত করে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর শ্রমবাজার খুলতে পারে। আর চুক্তি নবায়ন ও হালনাগাদ করার জন্য দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক জরুরি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে গতকাল প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি চালু করতে আগামী মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবেন। আমরা আশা করি খুব সহসায় এই জট খুলবে। মন্ত্রী আরো বলেন, শ্রমবাজারটিতে সিন্ডিকেট ভাঙা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একমত হয়েছে দুই দেশ। এজন্য দুই দেশের পরবর্তী বৈঠকে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধনের জন্য আলোচনা হবে।
গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি কর্মী নিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। সেই সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধ করা এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও তিনি বৈঠকে তোলেন। আনোয়ার ইব্রাহীম বলেন, মালয়েশিয়ার কর্মী দরকার। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো কর্মী এবং তাদের পরিবারের সুরক্ষা। কারণ এ খাতটি নিয়ে অনেক বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক দিক, শ্রমিকদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের শোষণ করা, তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা এবং কেবল নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করার এই চলমান প্রবণতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন, সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক করার বিষয়ে দুই দেশই আলোচনায় জোর দিয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অব্যাহত, নিরাপদ এবং পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে নতুন একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া তৈরি করা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, অনুমোদিত এ ধরনের যে কোনো কোটার ক্ষেত্রে উভয় দেশই কেবল নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন এবং প্রতিযোগিতামূলক নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের "অব্যাহত, নিরাপদ এবং পারস্পরিক কল্যাণকর" অভিবাসন নিশ্চিত করতে দুই দেশই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজে) বৈঠক আহ্বান করতে সম্মত হয়েছে।
এই বৈঠকে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মূল্যায়ন এবং উভয় দেশের বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন ও হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের ভিত্তি স্থাপনের ওপর আলোকপাত করা হবে। কর্মী নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়েছে মালয়েশিয়া। দুই প্রধানমন্ত্রী জনগণের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানকে স্বাগত জানান। তারা উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ায় সফর ঘিরে আশা করা হয়েছিল, দেশটির শ্রমবাজার দ্রুতই খুলবে। বাস্তবতা হচ্ছে খুব দ্রুত খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমবাজার খুলতে আরো সময় লাগতে পারে। কী প্রক্রিয়ায় দেশটিতে নতুন করে কর্মী যাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি মালয়েশিয়ার সরকার।
সূত্র বলছে, সে দেশে সাধারণ বিদেশি কর্মী নিয়োগ কাঠামো সক্রিয় থাকলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য গণহারে প্রবেশ চ্যানেল আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অপেক্ষায় স্থগিত রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ আবার শুরু করতে এবং জট দূর করতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তবে শ্রমবাজার আবার চালু হওয়ার বিষয়টি ওই দেশের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
জানা গেছে, মালয়েশিয়া নতুন একটি পদ্ধতিতে সব দেশ থেকেই কর্মী নিতে চায়। এ পদ্ধতিতে কর্মী নিতে মালয়েশিয়াকে নতুন একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। আগের পদ্ধতিতে এফডব্লিউসিএমএস নামে প্ল্যাটফর্ম থাকলেও মালয়েশিয়া সেই মাধ্যমে এখন আর নতুন করে কর্মী নিতে চাচ্ছে না। নতুন পদ্ধতিতে কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করতে চাচ্ছে সে দেশের সরকার। তবে এ ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি। সেজন্য মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নেওয়ার বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, কিছুটা দেরিতে হলেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার দরকার। সিন্ডিকেটমুক্ত করে স্বচ্ছতার সাথে দেশটিতে শ্রমিক পাঠানোর দরকার। তিনি আশা করেন, দু’দেশের সরকার মিলে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বেশকিছু নতুন শর্ত আরোপ করেছে, যা সিন্ডিকেট গঠনে উৎসাহিত করবে। বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৫০০ এজেন্সি সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স পেয়েছে। কিন্তু তাদের সবাইকে সমান সুযোগ না দিয়ে এই নতুন শর্তগুলো আমাদের সরকারের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।
গত মাসে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর বলেছিলেন, মালয়েশিয়া সরকারের দেওয়া শর্তে রাজি না হলে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধই থাকবে। এরপর বিষয়টি আরো বেশি আলোচনায় আসে। প্রতিমন্ত্রী ওই সময় বলেছিলেন, বাস্তবতা হচ্ছে, মার্কেট বন্ধই আছে। আমরা যদি সিন্ডিকেট কিংবা ফেয়ার রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম—যা-ই বলেন—তাদের এ ধরনের শর্তে রাজি না হই, তবে মার্কেট যেভাবে বন্ধ আছে সেভাবেই থাকবে।
নূরুল হক নুর আরো জানান, মালয়েশিয়া ১০টি শর্ত দিয়েছিল। সেসব শর্ত মানলে বাংলাদেশে ৫ থেকে ৭টি রিক্রুটিং এজেন্সির বেশি কেউ কর্মী পাঠাতে পারবে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনটি শর্ত মওকুফ করা সম্ভব হয়। এরপর ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির জমা দেওয়া হয় তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে। কিন্তু তারপরও শ্রমবাজারটি বন্ধই রয়েছে।
অবশ্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়া সফরে যাওয়ার আগে শ্রমবাজার দ্রুত আবার খোলার লক্ষ্যে বিতর্কিত নিয়োগ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমাদের জিহাদ। বাজার কবে নাগাদ খুলবে জানতে চাইলে আরিফুল উত্তর দেন, 'খুব তাড়াতাড়ি হবে।'
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, 'মালয়েশিয়া একা কোনো সিন্ডিকেট চাপিয়ে দিতে পারে না। বাংলাদেশ চাইলে তা ঠেকাতে পারে।'
জানা গেছে, গত বছরের ২১-২২ মে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার তৃতীয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় ১৭ হাজার ৭৭৭ জন কর্মীর মধ্যে সে দেশে যেতে না পারা মোট ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীকে পাঠানোর জন্য সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুধু কনস্ট্রাকশন ও ট্যুরিজম—এই দুটি খাতে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত বছরের ২৫ নভেম্বর এই কর্মীদের মালয়েশিয়া যাওয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার যেতে পেরেছেন। বাকিদের আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ দেবে মালয়েশিয়া সরকার।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেছেন, আমাদের কিছু আটকে পড়া কর্মী ছিলেন, যারা বাংলাদেশ থেকে আসতে পারেননি। এই সংখ্যাটা ৮ হাজারের মতো, এর ভেতরে একটা বড় সংখ্যা বাংলাদেশ থেকে না আসতে পারলেও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের পর—মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, যারা বাকি রয়েছেন ৫ হাজারের মতো কর্মী, তাদের জন্য এই ডিসেম্বর পর্যন্ত টাইম দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো সেক্টরে এসে ওনারা কাজ করতে পারবেন। উপদেষ্টা বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য নীতিগতভাবে সরকারের যে অবস্থান, তার ভেতর থেকে সর্বোচ্চ প্রাপ্তিটুকু যেন ওনারা বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিত করতে পারেন।
দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে দেশটির শ্রমবাজার বিদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে পারেননি। তবে তার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে আবার সে দেশে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় মালয়েশিয়া সরকার। সেসব কর্মীর মধ্যে এখনো প্রায় ৫ হাজার জন মালয়েশিয়া যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বরাবরই আলোচনায় ছিল সিন্ডিকেট। ২০০৮ সালে বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আট বছর পর তা চালু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে ফের ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সেই বাজার খুলতে সময় লেগেছিল তিন বছর। ২০২২ সালের আগস্টে দেশটিতে আবারও বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে আবার এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়। অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রিত হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। অভিবাসন ব্যয়ের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে। তাই সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার চান জনশক্তি রফতানিকারকদের একাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে চুক্তির পরপরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার নজির নেই। চুক্তির পর কী পরিমাণ কর্মী যাবে, কোন প্রক্রিয়ায় যাবে, শর্ত কী থাকবে—এগুলো নিয়ে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী যাওয়া শুরু করে। এই বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি নবায়ন করবে সরকার। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এটি হালনাগাদ করার জন্য দুই দেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করতে হবে। সেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর চুক্তি সই করা হবে।
চুক্তি নবায়ন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, আমরা এমওইউ যেটা শ্রমবাজারের জন্য রয়েছে, এটা নতুন করে রিনিউয়াল করব। সেটির জন্য ইতোমধ্যে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। আমাদের স্বাভাবিকভাবে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন আলোচনা এবং সমঝোতা ভিত্তিতে হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীসহ দুই দেশ যেহেতু একসঙ্গে বসেছেন, আমাদের শ্রম চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দুটো প্রক্রিয়া আরো অনেক বেশি বেগবান হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, মালয়েশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং বিশ্বের আরো যেসব দেশ আছে—আমরা আমাদের যে চলমান প্রক্রিয়া, তার মাঝে সেই সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই বাজার উন্মুক্তকরণের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।
নতুন শর্তগুলো যেভাবে আলোচনায় আসে
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয়। তাতে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চাওয়া হয়। পরে মালয়েশিয়াকে অন্তত তিনটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। এই শর্তগুলো হলো—গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা ও গত তিন বছর ধরে অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি স্থায়ী অফিস স্পেস থাকা।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মালয়েশিয়া সরকারকে দিয়ে পাঠিয়ে এই শর্তগুলো মওকুফের অনুরোধ করেন। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—অন্তত পাঁচ বছরের বৈধ লাইসেন্স থাকা, কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট ও বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড না থাকা।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, একই মানদণ্ডের আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের এজেন্সিগুলোকে বাছাই করা হবে। তবে নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দি অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য মালয়েশিয়ার প্রস্তাবিত এই মানদণ্ড প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই সময় বায়রার অনেক সদস্য সরকারকে এই অন্যায্য শর্তগুলো মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, স্বল্পসংখ্যক এজেন্সির মধ্যে কর্মী পাঠানোর অধিকার সীমাবদ্ধ করে দিয়ে এটি আরেক সিন্ডিকেটের পথ প্রশস্ত করতে পারে। এর আগে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ সব দেশের বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনার মধ্যে রেখেছে। আমরা আশা করি এই রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে।
সিন্ডিকেট ব্যবস্থা চালুর পর থেকে বারবার বন্ধ হয়েছে বাজার
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তথ্যমতে, সিন্ডিকেট ব্যবস্থার শুরু ২০১০ সালে। সে সময় অনুমোদিত এজেন্সির সংখ্যা প্রথমে মাত্র ১০টি করা হয়েছিল। পরে এটি শ্রম অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। সম্প্রতি ১০০টি এজেন্সির সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, তারা ২০২৪ সালের মে মাসের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৮ হাজার কর্মী পাঠাতেও ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রথমবার বন্ধ হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৬ সালে শ্রমবাজারটি আবার খোলা হলেও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ২০২২ সালে বাজারটি আবার খুললেও ২০২৪ সালে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার যদিও এ ধরনের অভিযোগের সম্মুখীন হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন যে বর্তমান প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ না হলে আবারও সেই একই ব্যবস্থার পুনরুত্থান ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসন রুটের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করা মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, উভয় দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট গঠনে ভূমিকা রেখে আসছে। এর ফলে শেষপর্যন্ত শোষণের শিকার হন কর্মীরা। তিনি আরো বলেন, 'বর্তমান সরকারও যদি একই পথে হাঁটে, তবে শ্রম অভিবাসন খাতে স্বচ্ছতা আনা এবং স্বল্প খরচে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হবে।' মালয়েশিয়ার দেওয়া এসব 'অযৌক্তিক শর্ত' এড়াতে বাংলাদেশকে আরো জোরালোভাবে আলোচনায় যুক্ত হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরো দেরি হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









