রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরুর চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয় দলটি। শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ মধ্যমসারি কিংবা তৃণমূলের নেতাদের অনুপস্থিতিতে কর্মী-সমর্কদের তেমন কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ সারাদেশে ঝটিকা মিছিল, লিফলেট বিতরণ ও ভার্চুয়াল কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও শেষ পর্ন্ত আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ও সরকারি ও বিরোধী দলের তৎপরতায় মাঠে নামতে পারেনি। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা, আইনগত বাধা এবং প্রশাসনিক নজরদারির কারণে দলটির প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফেরার পথ এখনও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নাশকতা ঘটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে চেয়েছিল। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তা নস্যাৎ করে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিদর্শনের পর পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবাড়ায় এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা দেশ-বিদেশে লুকিয়ে আছেন। আত্মগোপনে থেকে আজ দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারা দেশে মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে তারা। এরপর পুলিশ সারা দেশে নজরদারি বাড়ায়। রাজধানীতে কড়া পাহারা বসায় ঢাকা মহানগর পুলিশ।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েতের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে চাইছে। তাদের (আওয়ামী লীগ) এই পরিকল্পনাকে আমরা এখন পর্যন্ত নস্যাৎ করে দিয়েছি। আমি আশা করি, সামনে তারা কোথাও মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হতে পারবে না।’
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল বলে জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের। বাইরে থেকে ঢাকায় আসার পরিকল্পনাও ছিল। সেই তথ্য আগাম পেয়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সে অনুযায়ী তিন দিন ধরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোসহ বিভিন্ন চেকপোস্টে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মোবাইল প্যাট্রল, সাদা পোশাকে টহলের সংখ্যাও বাড়ানো হয়। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাইরের জেলাগুলো থেকে রাজধানীতে আসার পরিকল্পনা ঠেকাতে ঢাকার প্রবেশমুখ, ট্রেনস্টেশন, বাসস্টেশনসহ সব জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান ডিএমপি কমিশনার।
দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে এসব কর্মসূচি প্রকাশ্যে নয়; বরং হঠাৎ করে মিছিল বা সমাবেশ করে দ্রুত স্থান ত্যাগের পরিকল্পনা ছিল। দলটির তৃণমূল পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একসময় এলাকায় দলীয় কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটত। এখন নিজের পরিচয় দিতেও ভয় লাগে।
অনেক সহকর্মী ঘরছাড়া, কেউ মামলা নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আবার রাজনীতি থেকেই দূরে সরে গেছে। নির্বাচনের পর ভেবেছিলাম পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে, অন্তত সংগঠনের খোঁজখবর নিতে পারবো। কিন্তু এখনো সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। তারপরও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা আশা জেগেছে। আমরা চাই দল আবার সাংগঠনিকভাবে দাঁড়াক এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফিরতে পারুক।
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ কারাগারে এবং অন্য অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করায় সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার আশা তৈরি হয়। বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা মিছিল ও সীমিত কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করে দলটি। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয়ও সাময়িকভাবে খোলা হয়েছিল।
তবে তৃণমূল নেতাদের দাবি, নির্বাচনের পরও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক বাধার কারণে অধিকাংশ উদ্যোগ টেকেনি। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী সংসদে পাস হওয়ায়, দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
রাজধানীতে আ.লীগের ২৬ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার
রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা অবনতি ও নাশকতার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ২৬ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সোমবার রাজধানীর ৮টি থানা এলাকায় এসব অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ডিএমপি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রমনা থানা এলাকা থেকে ২ জন, ধানমন্ডি থেকে ১০ জন, বংশাল থেকে একজন, খিলক্ষেত থেকে ২ জন, কদমতলী থেকে একজন, মোহাম্মদপুর থেকে ৮ জন, মিরপুর থেকে একজন এবং তুরাগ থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার, আটক ৬
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা অবনতি ও নাশকতার আশঙ্কায় গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আনসার সদস্যের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত জেলার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় রাস্তাঘাটে লোকসমাগম কিছুটা কম দেখা গেছে। জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান জানান, বর্তমানে গোপালগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









