রেলওয়ে যেন এক আলাদিনের চেরাগ! যেখানে মেধা আর জ্যেষ্ঠতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১০ কোটি টাকার ঘুষের বিনিময়ে বসা যায় শীর্ষ পদে। দেশের যোগাযোগ খাতের অন্যতম লাইফলাইন রেলপথকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট, যার কেন্দ্রবিন্দুতে খোদ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর 'পোষ্যপুত্র' খ্যাত বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। পদ্মা সেতু রেলসংযোগ থেকে শুরু করে খুলনা-মোংলা প্রকল্প—সবখানেই বসেছিল শত শত কোটি টাকার লুটের হাট।
মেগা প্রকল্পগুলোতে পাথরের বদলে ইটের খোয়া ব্যবহার করে ঠিকাদারদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট নথিপত্র এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টেবিলে। সরকার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোলপাল্টে রাতারাতি ‘বিএনপিপন্থী‘ বনে যাওয়া এই কর্মকর্তার দুর্নীতির সাম্রাজ্য ও অর্থ পাচারের ফিরিস্তি। রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রেলের এই ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’, বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচারের রোমহর্ষক কাহিনী নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় পর্ব।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন দিয়েছেন রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী। সম্প্রতি জমা দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে আফজাল হোসেনকে ‘দুর্নীতির সিন্ডিকেটের প্রধান’, ‘ঘুষখোর’ এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘পোষ্যপুত্র’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পদ্মা সেতু রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প এবং খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আফজাল হোসেন ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম করেছেন। একই সঙ্গে রেলওয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগ পেতেও তিনি ঘুষ দিয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। রমজান আলী অভিযোগ করেন, “রেলওয়েকে একটি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে’, যেখানে ঠিকাদার, আমলা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করেছে।
অভিযোগপত্রে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে পদ্মা সেতু রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর দাবি, প্রকল্পের মূল চুক্তিপত্রের বিভিন্ন কাজ বাতিল করে সম্পূরক চুক্তির মাধ্যমে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। এতে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রেললাইনের এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণে নির্ধারিত পাথরের পরিবর্তে কম খরচের ইটের খোয়া ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, এতে ঠিকাদারদের শত শত কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়। রমজান আলীর দাবি, এই প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তিও রয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে, যেখানে আফজাল হোসেনের সন্তানরা বসবাস করেন।
খুলনা-মোংলা পোর্ট রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রূপসা সেতু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমেও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
রমজান আলীর অভিযোগপত্রে আরো দাবি করা হয়, রেলওয়ের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেতে আফজাল হোসেন প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্য কর্মকর্তারা এগিয়ে থাকলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আফজাল হোসেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পেয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, ‘দুদকের ছাড়পত্র ছাড়াই’ তাকে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা সরকারি বিধিবিধানের পরিপন্থী।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মো. আফজাল হোসেন ১৩তম বিসিএস পরীক্ষায় রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক ক্যাডারের সম্মিলিত মেধাতালিকায় ২২তম স্থানে ছিলেন। অথচ উক্ত মেধাতালিকায় ১ম স্থান অধিকারী বুয়েটের কৃতী ছাত্র পার্থ সরকারকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাদ দিয়ে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেলপথ উপদেষ্টাকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে তিনি রেলওয়ের ‘মহাপরিচালক’ পদে পদায়িত হন। এছাড়া, দুদকের কোনো ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) ছাড়াই এবং ‘তৃতীয়’ গ্রেড থেকে সরাসরি ‘প্রথম’ গ্রেডে পদায়ন করার মতো একাধিক সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে রেলওয়ের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী দুর্নীতির চক্রের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। রমজান আলীর ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, টেন্ডার ও সরবরাহ কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের দেওয়া হতো এবং বিনিময়ে কমিশন আদায় করা হতো। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের কাছ থেকে চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের কাজ করে পুরো বিল তুলে নেওয়ারও অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগের নথিতে মো: আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভুয়া বিল ও টেন্ডার জালিয়াতির খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য - সান্তাহার রেলওয়ে সাইডিং-এ ১০০০ ঘনমিটার ব্যালাস্ট (পাথর) সরবরাহের চুক্তির বিপরীতে মাত্র ৪৯৯ ঘনমিটার পাথর সরবরাহ করে সম্পূর্ণ ১০০০ ঘনমিটারের ভুয়া চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করা হয়। বিভিন্ন চুক্তিপত্রের অনুকূলে সর্বমোট ৬টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রায় ৩.৪০৯৪ কোটি টাকা ঠিকাদারদের প্রদান করে তার বিপরীতে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম), রাজশাহী হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার মো. আশরাফ আলী এবং মেসার্স সফল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলাল পারভেজ লুলুর সাথে যোগসাজশে ৩.৪০৯৪ কোটি টাকার ভুয়া বিল ভাউচার প্রস্তুত করে রেলওয়ের বিপুল আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আফজাল হোসেন সরকার পরিবর্তনের পর দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বিএনপিপন্থী পরিচয়ে সক্রিয় হন। রমজান আলীর অভিযোগ, ‘ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন’ আফজাল হোসেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত শত শত কোটি টাকা মো: আফজাল হোসেন মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করেছেন, যেখানে তার ছেলে-মেয়েরা বসবাস করছেন। দেশেও তিনি নিজ নামে এবং স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা এবং তার মামা লিটন কনট্রাক্টরের নামে শত শত কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও স্বর্ণালঙ্কার ক্রয় করেছেন।
দুদকের কাছে দেওয়া আবেদনে আফজাল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে অভিযোগকারী বলেন, ‘রেলওয়েকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।’ এই অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে বা আফজাল হোসেনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









