লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বেড়েই চলেছে পানি। এরই মধ্যে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরের গঙ্গাচড়া-মহীপুর ও কুড়িগ্রামে চর ও নিম্নাঞ্চলের এলাকাগুলোতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মাঝে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও থামছে না নদী দুটির আগ্রাসন। ভাঙন ও পানিপ্রবাহ ধেয়ে আসছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতির দিকে। চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ওই ছয়টি জেলার দুই নদীপাড়ের লাখো মানুষ।
বন্যার আতঙ্কে চার জেলা: পাউবো সূত্র জানায়, সোমবার পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার সকালে উজানের ঢলে উত্তরের চারটি জেলায় তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করে। লালমনিরহাট-নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বিকেল তিনটা থেকে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছিল, উজানের ঢলে তা অতিক্রম করেছে বিপৎসীমা।
হঠাৎ পানি বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ। লালমনিরহাট সদরের মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার একজন মৎস্যচাষি বলেন, ‘হঠাৎ পানি বাড়ছে, বৃষ্টিও পড়ছে। পুকুরে মাছ রয়েছে, সেগুলো ভেসে যায় কি না- তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ভাঙনও দেখা দেবে। কবে যে তিস্তার কাজ হবে আর আমাদের এই কষ্ট দূর হবে তা জানি না।’ তিস্তার চরখড়িবাড়ির আরেকজন চাষি বলেন, ‘তিস্তা প্রচণ্ড গর্জন, শো-শো শব্দ এলাকা কাঁপিয়ে তুলেছে। বড় ধরনের বন্যা হতে পারে বলে আমাদের সর্তক করা হয়েছে।’ এবার তিস্তায় আগাম উজানের ঢলের কারণে চরের জমিতে আমন ধান চাষ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী গতকাল বিকেলে বলেন, তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিকেল তিনটায় ৫২ দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। যদিও সকাল ছয়টায় বিপৎসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার এবং সকাল নয়টায় পানি ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরে বেলা ১২টার দিকে তা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে নেমে যায়। কিন্তু এরপরই পানি বাড়তে থাকে এবং বিকেল তিনটার দিকে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায় বলেও জানান এই প্রকৌশলী।
তিনি বলেন, ‘পানি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খোলা রয়েছে। উজানের ঢলে এভাবে পানি বাড়ছে। তিস্তার নিম্নাঞ্চলের মানুষকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।’
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে সোমবার বেলা ১২টায় পানির উচ্চতা ছিল ৫১ দশমিক ৭৬ মিটার (বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার নিচে); যা বিকেল তিনটা পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল। তবে পরবর্তী তিন ঘণ্টায় পানি দ্রুত বেড়ে সন্ধ্যা ছয়টায় ৫১ দশমিক ৯৮ মিটার (বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচে) পৌঁছায়। এরপর আরো তিন ঘণ্টায় ৭ সেন্টিমিটার বেড়ে রাত নয়টায় ৫২ দশমিক ০৫ মিটার (বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে) প্রবাহিত হয়।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, লালমনিরহাটের প্রধান দুটি নদী তিস্তা ও ধরলায় প্রতি বছরই উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে পানি বেড়ে যায়। ফলে বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। গত দুই দিনে উজানের ঢল ও বৃষ্টির কারণে পানির এই ওঠানামায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের তথ্যমতে তিস্তা নদীর উজানের দোমোহনী পয়েন্টে গতকাল দুপুর দুইটায় সেখানকার বিপৎসীমার (৮৫ দশমিক ৯৫) ৩৭ সেন্টিমিটার (৮৫ দশমিক ৫৮) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে বাংলাদেশ অংশের ডালিয়ায় তিস্তার ব্যারেজ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তার প্রবাহ দুপুর দুইটায় বিপৎসীমার (৬৫ দশমিক ৯৫) ১০ সেন্টিমিটার (৬৬ দশমিক ০৫) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ও টেপাখড়িবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন জানান, তিস্তা নদীর পানি হু-হু করে বেড়ে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। উজান থেকে যে ঢল নামছে সেখানে প্রচণ্ড ঘোলা পানি আসছে। এতে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন তারা।
নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের জানমাল রক্ষায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বা এর কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তা আবার কমেও যেতে পারে। তবে পানি বাড়ায় যেসব পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিতে পারে, সেগুলো রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ভাঙনরোধে পর্যাপ্ত বালুভর্তি জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ: ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করলেও কাজে আসছে না তা। ভাঙন ধেয়ে আসছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতির দিকে, ফলে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
উপজেলার শহড়াবাড়ি যমুনা নদীর ঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলার স্থানে গতকাল মঙ্গলবার ফের ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে ভয়াবহ ভাঙনে প্রায় ৫৫ মিটার অংশের জিও ব্যাগ ও টিউবসহ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে গত তিনদিনে প্রায় ১৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়। অথচ সেখানে ভাঙন ঠোকাতে তিন দিন ধরে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ এবং টিউব ফেলা অব্যাহত রয়েছে। তবে নদীপাড়ের মানুষের দাবি এখন ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান দরকার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শহরাবাড়ি গ্রামে গত বছরের অক্টোবরে যমুনা নদীর আকস্মিক ভাঙনে সমতল ভূমিসহ নয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সে সময় স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে নদীর তলদেশ ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় এবং পানির প্রবল স্রোতে ঘূর্ণাবর্তে এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। পরে ভাঙনকবলিত তীর ধরে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ডাম্পিং করার মাধ্যমে ভাঙন রোধ করা হয়।
২০০৩ সালে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান গ্রামের মাঝখানে নদীতীরবর্তী এলাকায় আড়াআড়ি প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি স্পার নির্মাণ করা হয়েছে। যমুনা নদীর ভাঙন রোধে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে ২০০৭ সালে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে।
নদী ভাঙনের খবর পাওয়ার পর পরই স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও বিশেষ টিউব ফেলার কাজ পরিচালনা করছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, ‘ভাঙন শুরু হওয়ার পরই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বালুভর্তি বিশেষ টিউব ভাঙন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ কারণে নদী ভাঙনে বিশেষ ক্ষয়ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।’
সরেজমিন শহড়াবাড়ি গ্রামে দেখা যায়, ভাঙন স্থানে বালুর বস্তা ফেলছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন। বাঁধের ওপর রয়েছে মানুষের বাড়িঘর। ভাঙনকবলিত লোকজন জানায়, গত দুই দিনের নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
সূত্র অনুসারে, গত তিন দিনে যমুনার পানি কাজীপুর পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার এবং সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কাজীপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩ দশমিক ২ মিটার এবং সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্টে ২ দশমিক ৬৫ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘উজান থেকে পানির চাপ ও বৃষ্টিপাতের কারণে যমুনার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী কয়েকদিন এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এই দফায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা কম।’
পাউবো পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত যমুনার পানি অন্তত পাঁচবার ওঠানামা করেছে। এই ওঠানামার কারণে চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক দিনে চর সলিমাবাদ এলাকায় পাঁচ থেকে ছয়টি বসতবাড়ি ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। আকস্মিক ভাঙনে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘মাত্র এক দিনের ব্যবধানে যমুনা আমার ঘরটা গিলে ফেলেছে। কোনো জিনিসপত্রও বের করতে পারিনি।‘
চৌহালী উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মওদুদ আহমেদ সবুজ বলেন, চর সলিমাবাদ পয়েন্টে প্রায় ১২০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। নতুন চর জেগে ওঠায় নদীর মূল স্রোত তীরবর্তী অংশে আঘাত করায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘ভাঙন রোধে পাউবো জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করেছে, যাতে ভাঙন আর বিস্তার লাভ করতে না পারে।’
এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষামূলক কাজের নির্দেশনা দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
নদী ভাঙনের খবর পাওয়ার পর পরই স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও বিশেষ টিউব ফেলার কাজ পরিচালনা করছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, ‘ভাঙন শুরু হওয়ার পরই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বালুভর্তি বিশেষ টিউব ভাঙন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ কারণে নদী ভাঙনে বিশেষ ক্ষয়ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









