একসময় এটি ছিল ক্ষমতা, প্রভাব ও বিত্তের জৌলুসের প্রতীক। বিশাল আয়তনের জমিজুড়ে নির্মিত বিলাসবহুল কটেজ, সুইমিংপুল, সারি সারি পুকুর, দৃষ্টিনন্দন লেক, শিশুপার্ক আর সবুজে ঘেরা অবকাশ কেন্দ্র নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামের এই পার্ককে ঘিরে একসময় ছিল ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও কৌতূহল।
কিন্তু সময় বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে পার্কটির অবস্থাও। দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর আলোচনায় আসে তার নামে থাকা বিপুল সম্পদের বিষয়টি। আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালে জব্দ করা হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কসহ তার বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।
বর্তমানে সেই পার্কের প্রধান ফটকে ঝুলছে আদালতের ক্রোকাদেশ। একসময় যেখানে ভিআইপি অতিথি, পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা। সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চললেও আগের সেই জৌলুস আর নেই।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল এলাকায় প্রায় ৬২০ বিঘারও বেশি জমির ওপর গড়ে তোলা হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পার্কের অভ্যন্তরে রয়েছে প্রায় ২০টি পুকুর, ১৪টি কটেজ, একটি আধুনিক সুইমিংপুল, শিশুপার্ক, বিনোদন কেন্দ্র, কৃত্রিম জলাধার এবং বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও এলাকাটিতে ছিল বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং গ্রামীণ বসতি। ধীরে ধীরে জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে গড়ে তোলা হয় বিশাল এই পার্ক। নির্মাণকাজের সময় থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ছিল।
বর্তমানে পার্কে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে বড় ফটকের পাশে আদালতের জব্দাদেশের নোটিশ। ভেতরের অধিকাংশ অবকাঠামো অক্ষত থাকলেও দর্শনার্থীদের সংখ্যা কমে গেছে।
সাভানা পার্ককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা রয়েছে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে। পার্কের জন্য যেসব জমি ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব জমির একাংশের মালিকরা এখনো দাবি করেন, তারা স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করেননি।
সম্প্রতি দুবাইয়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের পর সেখানে গেলে কথা হয় স্থানীয়দের সাথে।
স্থানীয় কয়েকজন সাবেক জমির মালিক জানান, সে সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল কঠিন। অনেকেই নানা কারণে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে জমি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী সঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, জমি শুধু সম্পদ নয়, এটা আমাদের বাপ-দাদার স্মৃতি। সেই জমি হারানোর কষ্ট এখনো ভুলতে পারিনি। আমরা চাই তাকে দেশে এনে সঠিক বিচার করে এর একটা সমাধান হোক।
আরেক ভুক্তভোগী বাদল কুমার বলেন, আমার জমির পাশে জমি কিনে আমার জমিসহ বেড়া দিয়ে আটকে দিয়েছে। তারপর আমি পরিস্থিতির কারণে জমি ছেড়ে দিয়েছি। তখন যেটা বলা হয়েছে, সেটাই করতে হয়েছে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালে তার বিভিন্ন সম্পদ জব্দ করা হয়। এরপর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সরকার।
বর্তমানে ইজারার মাধ্যমে সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে পার্কটি। ইজারাদার কর্তৃপক্ষ বলছে, আদালতের নির্দেশনা মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
পার্কের বর্তমান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থাপনাগুলো সচল রাখা, পুকুরের মাছের উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি রোধে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্কের সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে দুই সরকারি বিভাগের মধ্যে। কৃষি সংশ্লিষ্ট সম্পদ ও স্থাপনাগুলোর তদারকি করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অন্যদিকে পুকুর ও জলাশয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মামুনুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশনা এবং জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্পত্তির স্থাবর সম্পদ সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, পার্কের অভ্যন্তরে থাকা পুকুর ও জলাশয়গুলোর দেখভাল করা হচ্ছে। মাছের উৎপাদন কার্যক্রম এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে।
একসময় যে পার্ককে ঘিরে ছিল ক্ষমতার প্রভাব, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনাগোনা এবং বিপুল বিনিয়োগের গল্প, আজ সেই পার্ককে ঘিরে রয়েছে অন্য বাস্তবতা। আদালতের জব্দাদেশ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বিতর্কের কারণে এটি এখন নতুন করে আলোচনায়।
পার্কের ভেতরে এখনো দাঁড়িয়ে আছে সুসজ্জিত কটেজ, জলাধার, সড়ক এবং বিভিন্ন অবকাঠামো। কিন্তু স্থানীয়দের অনেকের কাছে এগুলো শুধু একটি বিনোদন কেন্দ্রের স্থাপনা নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া জমি, স্মৃতি এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতীক।
সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের ভবিষ্যৎ এখন আদালতের সিদ্ধান্ত ও চলমান আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। সম্পত্তিগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সেগুলো রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকবে নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থাপনায় যাবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে বৈরাগীটোলের অনেক মানুষের কাছে প্রশ্নটা ভিন্ন। তারা জানতে চান, যে জমিগুলো একসময় তাদের ছিল, সেই জমির ইতিহাস কি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সামনে আসবে? আর ক্ষমতার প্রভাবে জমি হারানোর যে অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে উচ্চারিত হয়েছে, তার কোনো বিচার বা সমাধান কি হবে?
একসময় ক্ষমতা ও বিত্তের প্রতীক হয়ে ওঠা সাভানা পার্ক আজ আদালতের জব্দ করা সম্পদ। কিন্তু এর দেয়ালের বাইরে এখনো বেঁচে আছে জমি হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অপূর্ণতা আর অজস্র প্রশ্নের গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









