দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ক্যানভাসে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। তবে কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক পরাশক্তির একতরফা বশ্যতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব কক্ষপথে হাঁটছে ঢাকা। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর শেষে চলমান চীন সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মহলে এখন নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে।
বলা হচ্ছে- তারেক রহমান কি তাঁর বাবা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই পূর্বমুখী কূটনীতিতে ঝুঁকছেন? নাকি ভারতের মতো পরাশক্তিকে পাশ কাটিয়ে বেইজিংকে বেছে নেওয়ার পেছনে অন্য কোনো কৌশল রয়েছে? কূটনৈতিক করিডোরে এখন এটাই সবচেয়ে বড় আলোচনা।
দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা বলছেন, প্রথাগতভাবে দিল্লি বা ওয়াশিংটনকে প্রথম সফরের গন্তব্য বানানোর যে অলিখিত রেওয়াজ ছিল, তা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূলত বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাস্তবমুখী, বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রয়াত মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দূরদর্শী ‘লুক ইস্ট পলিসি’বা ‘পূর্বমুখী নীতিরই’ এক আধুনিক ও সুসংহত সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তবে এর কেন্দ্রে রয়েছে সম্পূর্ণ নতুন এক দর্শন—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (সর্বাগ্রে বাংলাদেশ)।
জানা গেছে, মালয়েশিয়া সফর শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাড়ি জমিয়েছেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনে। বেইজিংয়ে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের সাথে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে তিনি দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বিশেষ সামিটেও অংশ নেন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য কেন অস্তিত্বের সমার্থক, এমন প্রশ্নে উত্তর হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা।
সূত্র জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে ঢাকা বেইজিংয়ের কাছ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সমান্তরাল আর্থিক সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে চূড়ান্ত আলোচনা করছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ‘লোকাল কারেন্সি সোয়াপ’ (টাকা-ইউয়ান বিনিময়) এবং বাকি অংশ অত্যন্ত স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে আসবে, যা দেশের ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিকে দ্রুত স্থিতিশীল করবে।
এর পরই আছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি- যাকে বলা হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক গেম-চেঞ্জার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কৌশলগত এজেন্ডা হলো ‘তিস্তা রিভার বেসিন ম্যানেজমেন্ট’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা। ভারতের দীর্ঘদিনের টালবাহানা ও পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রকল্পে চীনের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, দুই পাড় সংরক্ষণ, এবং ১১২ কিলোমিটার বিস্তৃত আধুনিক ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা হবে। এটি সফল হলে উত্তরবঙ্গের চাষাবাদ ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং ভারতের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণের ভূ-রাজনৈতিক চাপ থেকে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে মুক্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা ও বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। বিশেষ করে চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, আইটি পণ্য ও চামড়াজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে চীনের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এর পরই আলোচনায় আছে অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রির প্রসার ও বিপ্লব। কারণ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় সোনাদিয়া বা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ চাঙ্গা করা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা ‘স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং’ও ‘সেমিকন্ডাক্টর’ (ইন্ডাস্ট্রি)-এর বিকাশে চীনের শীর্ষ প্রযুক্তিগত জায়ান্টগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এই সফরের অন্যতম বড় মাইলফলক।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির দৈনিক এদিনকে বলেন, "এখানে পিতামাতার দর্শনের উত্তরাধিকার যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনই রয়েছে একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাস্তবতার দাবি। ১৯৭০-এর দশকের শেষে শহীদ জিয়া চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে মজবুত বীজ বুনেছিলেন, আর ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া যে ‘লুক ইস্ট পলিসি’র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন— তারেক রহমান আজ তার পরিপক্ব ফসল ঘরে তুলছেন। তবে পার্থক্য হলো, এটি কেবল ‘পূর্বমুখী’নয়, এটি ‘পূর্বকেন্দ্রিক ভারসাম্য’।
তিনি বলেন, “পরাশক্তি ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যে আলোচনা চলছে, তা মূলত ভারতের একতরফা ও আধিপত্যবাদী নীতিকে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া— বাংলাদেশ কোনো একক দেশের তোষামোদ করবে না, ঢাকার নীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।"
এদিকে চীন সফরে যাওয়ার ঠিক আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের এক সংক্ষিপ্ত সফরে মালয়েশিয়া যান। সেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে তিনটি চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় দলিল সই ও বিনিময় হয়। এর মধ্যে উভয় দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সুরক্ষা সংক্রান্ত নতুন দলিল চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ ছাড়া কাউন্টার-টেররিজম রিসার্চ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত চুক্তিও স্বাক্ষর করে উভয় দেশ।
তবে এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো, এর মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) চূড়ান্ত করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এদিনকে বলেন, "তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সাহসী এবং সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কৃত্রিম একমুখী ঝোঁক তৈরি হয়েছিল, যা ভারতের স্বার্থকে যতটা রক্ষা করেছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ততটা ক্ষুণ্ণ করেছে। তারেক রহমান বেইজিংকে দিয়ে সেই কৌশলগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করছেন। এটি শহীদ জিয়ার ‘সব দেশের সাথে বন্ধুত্বের’ বাস্তবমুখী প্রয়োগ। তবে চীনের সাথে ৬ বিলিয়ন ডলারের ডিল এবং তিস্তা প্রকল্পের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন নিজের স্বার্থ কোথায় তা খুব ভালো করেই চেনে।"
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির খোলনলচে বদলে ফেলার সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান। তিনি তার বাবা শহীদ জিয়ার দূরদর্শিতা এবং মায়ের ‘লুক ইস্ট’ দর্শনকে ধারণ করেও নিজেকে একবিংশ শতাব্দীর এক বাস্তববাদী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কোনো আঞ্চলিক দাদাগিরি বা পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে মাথা নত না করে, বেইজিং অক্ষের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন— আগামী দিনের বাংলাদেশের কূটনীতির একমাত্র ধ্রুবতারা হবে কেবলই ‘জাতীয় স্বার্থ’। আর এই স্বাধীন চেতনার যাত্রাপথেই রচিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির এক নতুন অধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রীর চীন যাত্রার অর্থনৈতিক সমীকরণ নিয়ে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যে এদিনকে বলেন, "চীনের সাথে ৬ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্যাকেজের আলোচনা প্রমাণ করে— নতুন সরকার ভূ-রাজনৈতিক রাজনীতির চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, পিতা বা মাতার আমলে বৈশ্বিক ঋণের ফাঁদ (Debt Trap) এমন চতুর ছিল না, যা আজকের বিশ্বে রয়েছে। তাই চীনের কাছ থেকে তহবিল নেওয়ার ক্ষেত্রে সুদের হার ও শর্তাবলীর ব্যাপারে কঠোর দরকষাকষি করতে হবে।"
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন এদিনকে বলেন, "চীনের সাথে এই ঘনিষ্ঠতা ঢাকাকে ওয়াশিংটন ও দিল্লির ভূ-রাজনৈতিক রাডারে নিয়ে আসবে, তা নিশ্চিত। তবে তারেক রহমানের কৌশলটি চমৎকার, কারণ তিনি সরাসরি কোনো সামরিক বা কৌশলগত জোটে না গিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সামনে এনেছেন। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে টিকে থাকতে হলে আমাদের এই ভারসাম্য বজায় রাখতেই হবে। ভারত বা আমেরিকার অসন্তোষ সামলাতে হলে ঢাকাকে তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান মজবুত রাখতে হবে এবং দেখাতে হবে যে চীনের সাথে এই সম্পর্ক কেবলই বাণিজ্য ও উন্নয়নের স্বার্থে, কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









