# দেশের স্বার্থেই বিদেশে কথা বলেছি : সংসদে প্রধানমন্ত্রী
# প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় সংসদের ধন্যবাদ
# মালয়েশিয়া-চীন সফর পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা
বাংলাদেশ সরকারের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল গণচীন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই চার দিনের বেইজিং সফর দেশের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য বয়ে এনেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে অত্যন্ত উষ্ণ ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেজিংয়ের দেওয়া এই দৃঢ় বন্ধুত্বের হাত বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং কৌশলগত অবস্থানে এক গভীর স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ব্যবসা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতসহ মোট ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ বৈঠকগুলোর মূল অর্জনগুলো হলো- আনোয়ারা ও মংলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘ইনভেস্টমেন্ট অফিস’খোলার ব্যাপারে চীনা শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত মিলেছে। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আরো বিস্তৃত করার আশ্বাস দিয়েছেন চীনা প্রিমিয়ার লি কিয়াং। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের কারিগরি ও আর্থিক বড় বিনিয়োগের পথ সুগম হয়েছে।
বৈঠক শেষে চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নযাত্রায় সম্পূর্ণ সমর্থন বজায় রাখবে। কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ঐতিহ্যবাহী চীনা নীতি ঢাকাকে একটি বড় ভূরাজনৈতিক স্বস্তি দিয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখার ব্যাপারেও চীন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ডলার সংকট এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের এই সময়ে চীনা সহায়তার আশ্বাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নেন, যেখানে চেরি গ্রুপসহ চীনের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্প গ্রুপ বাংলাদেশে ভারী শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর কলকারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর ফলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর থেকে বয়ে আনা ‘চীনা বন্ধুত্ব’ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে আরো মসৃণ, স্বাধীন এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে—এমনটাই মনে করছেন দেশের আপামর নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণ।
এদিকে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের জন্য জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিদেশ সফরে তিনি দেশের মানুষ ও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। সরকারপ্রধান গতকাল শনিবার সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলে তার উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পরে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য।’ বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে দলটির চেয়ারম্যান বলেছেন, “আমাদের দলের অবস্থান থেকে আমরা একটি স্লোগান ব্যবহার করি, সেটি হচ্ছে যে—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট বা বাংলাদেশ প্রথম’।’ সংসদ নেতা বলেন, ‘আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি, আমি আমার অবস্থান থেকে আমি আমার দেশের, আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এবং সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।’
এর আগে অধিবেশনের শুরুতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর সংসদের জোহরের নামাজের বিরতির আগ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করেন স্পিকার।
সংসদ সভাপতি বলেন, ‘মাননীয় সংসদ নেতা, আপনি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করার কিছুক্ষণ আগে এই সংসদের সকল সদস্য সরকারি দল এবং বিরোধী দল থেকে বক্তব্যের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব পাস করেছে আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে।’ স্পিকার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ফলে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংসদের সদস্যরা অভিমত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিকে, পররাষ্ট্রনীতিকে এক নতুন দিগন্ত সূচনা করেছেন আপনি এই সফরের মাধ্যমে। সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই সংসদের পক্ষ থেকে।’
এরপর প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘ওয়েলকাম ব্যাক টু দিস পার্লামেন্ট। আপনি কিছু বলতে চাচ্ছেন?’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জি মাননীয় স্পিকার, আমি কিছু কথা বলতে চাচ্ছি।’ সংসদের তরফে ধন্যবাদ জানানোয় সরকারপ্রধান কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘যে বিষয়ের উপরে আমাকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে এই সংসদের পক্ষ থেকে, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এবং আন্তরিকভাবে সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ সফরের অর্জনকে নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে না দেখে দেশের অর্জন হিসেবে দেখার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের কারোরই কোনো ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। এই সফরের মাধ্যমে যদি দেশের মানুষের কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি দেশের মানুষের অর্জন।’ বিরোধী দলের নেতাসহ সংসদের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করতে তারা তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু সংসদের সব সদস্য বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতা উনিও উৎসাহ প্রদান করেছেন দেশের জন্য দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করার জন্য, সেজন্য আবারো আমি আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে সব সদস্য, বিরোধী দলের নেতাসহ সব সদস্যকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ।’
এর আগে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক মর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ, হস্তক্ষেপ না করা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান প্রস্তাব সমর্থন করে বলেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে বিরোধী দল সরকারকে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে বিদেশের সঙ্গে মৌলিক চুক্তি সংসদে আনার আহ্বান জানান তিনি।
‘মালয়েশিয়া-চীন সফর পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা’
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে গতকাল শনিবার সকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দেন। আলোচনা শেষে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। পরদিন মালয়েশিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি চীন সফরে যান। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ সফরে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা ও দুটি দলিল বিনিময় করে বাংলাদেশ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









