সিরাজগঞ্জে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগ্রাসী হয়ে উঠছে যমুনা নদী। আর এতে নদীর পূর্বপাড়ে কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের দুটি ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। অন্যদিকে কয়েকটি নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের অন্তত ৭ টি জেলায় স্বল্পমেয়াদী বন্যা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
সিরাজগঞ্জ: ভয়াবহ নদীভাঙনে এর মধ্যে জেলা দুই উপজেলার ব্যাপক এলাকার প্রায় শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নদীতীরের মানুষজন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। ভাঙন ঠেকাতে নদীতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলের কথা জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান।
কাজিপুর উপজেলার চর গিরিশ চরে এক সময় ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদী ভাঙনের কারণে ১৫০টি পরিবার আগেই অন্যত্র চলে গেছে। গত ১০ দিনে অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে আরও শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটি যেকোনো সময় নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অপরদিকে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চর সলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলে প্রায় ৩ কি.মি. এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গেল ১০ থেকে ১৫ দিনের ভাঙনে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, বেসরকারি স্কুল ও দোকানপাটসহ অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন রোধে নদীতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেললেও তা কোনো কাজে আসছে না। স্থায়ী সমাধান হিসেবে নদী তীরের বাসিন্দারা ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
ভাঙন এলাকা পরিদর্শনের কথা জানিয়ে চৌহালীর ইউএনও নুরুল আমিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীর ও চরাঞ্চলের বসতিদের মধ্যে ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর মধ্যে এসব অঞ্চলের আবাদি জমির ফসল নদীতে তলিয়ে গেছে। মানুষজন নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না। পাউবোর সিরাজগঞ্জ অফিস জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সদর পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৫১ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১৯৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা এলাকায় নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
মোখলেছ বলেন, ভাঙনরোধে চৌহালী উপজেলার একটি স্থানে এবং সিরাজগঞ্জ সদরের বাহুকা এলাকায় কাজ চলছে। যমুনা নদীর বিশাল এলাকজুড়ে চরাঞ্চল। এসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিলে আসলে কিছু করার থাকে না। তবে সরকার যদি চরাঞ্চল রক্ষায় উদ্যোগী হয়, তাহলে সমীক্ষা করে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে বলে জানান পাউবোর এই কর্মকর্তা।
উত্তরাঞ্চল: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গত শনিবারের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে আগামী ৭২ ঘণ্টায় স্বল্পমেয়াদী বন্যা হতে পারে।এছাড়া নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদী, সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে সুরমা নদী, মৌলভীবাজার সদর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, অপরদিকে দুধকুমার নদীর পানি সমতল কমেছে। তবে তা আগামী ৩ দিন বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী ৭২ ঘন্টায় এসব নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে সিলেট বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি এবং উজানে ভারতের মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে আগামী ৫ দিন ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার নদ-নদীর পানি সমতল বেড়েছে। আগামী ৫ দিন তা অব্যাহত থাকতে পারে।
কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বেড়েছে, অন্যদিকে সুরমা নদীর পানি সমতল কমেছে। তবে আগামী ৩ দিন তা বাড়তে পারে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের খোয়াই ও সোমেশ্বরী নদীর পানি সমতল বেড়েছে, অন্যদিকে মনু ও ধলাই নদীর পানি সমতল কমেছে। আর সারিগোয়াইন ও যাদুকাটা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে; যা আগামী ৩ দিন বাড়তে পারে।
এ সময় সোমেশ্বরী নদী নেত্রকোণা জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে কেন্দ্র থেকে সতর্ক করা হয়েছে ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









