সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্কের সেতুবন্ধনটি যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এই সম্পর্কের প্রধানতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রশাসনিক সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। কাগুজে নথিপত্রের ধুলোমাখা স্তূপ এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার যে স্বপ্ন নাগরিকরা দেখেছিলেন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বা ই-গভর্ন্যান্সের প্রবর্তন নিঃসন্দেহে সেই স্বপ্নের পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আজ জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জন্মনিবন্ধন, ই-পাসপোর্ট, ভূমি রেকর্ড, টিন সার্টিফিকেট কিংবা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এক একটি বিশাল ডিজিটাল ডাটাবেজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ যখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, কারিগরি অদক্ষতা বা উদাসীনতার কারণে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে এক অন্তহীন অভিশাপে পরিণত হয়। ডিজিটাল ডাটাবেজের সামান্য ভুলভ্রান্তি বা ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ কীভাবে একজন নাগরিকের জীবনে ভয়াবহ ভোগান্তির পাহাড় ডেকে আনতে পারে, তা আজ এক গভীর সামাজিক ও কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে।
একটি সরকারি ডাটাবেজের সামান্য ভুল কিংবা একটি সার্ভারের সাময়িক অকার্যকারিতা একজন আইটি প্রফেশনাল বা সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের কাছে হয়তো কেবলই একটি সাধারণ ‘এরর কোড’ বা ‘বাগ’, কিন্তু একজন সাধারণ খেটে খাওয়া নাগরিকের কাছে তা এক জীবনঘাতী দুঃস্বপ্ন। ধরা যাক, কোনো একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানানে একটি অক্ষরের ভুল কিংবা জন্মতারিখে একটি সংখ্যার অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এই একটিমাত্র যান্ত্রিক বা টাইপোগ্রাফিক্যাল ভুলের কারণে সেই মানুষটির পুরো জীবন থমকে যেতে পারে। তিনি হয়তো ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হবেন, তার অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট করতে গিয়ে মাসের পর মাস আটকে থাকবেন, কিংবা বহু কষ্টে জোগাড় করা একটি সরকারি চাকরি বা বিদেশ যাওয়ার সুযোগ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবেন। এমন অসংখ্য ঘটনা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটছে, যেখানে একজন কৃষক তার জমির পর্চা বের করতে গিয়ে ডিজিটাল বিভ্রাটের শিকার হয়ে দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ধরনা দিচ্ছেন, কিংবা একজন বৃদ্ধ পেনশনভোগী তার জীবিত থাকার ডিজিটাল প্রমাণ দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই মানুষগুলোর হাহাকার সার্ভারের হার্ডডিস্কে রেকর্ড হয় না, কিন্তু তাদের চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস প্রমাণ করে যে আমাদের ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি কতটা নড়বড়ে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যন্ত্রের কোনো আবেগ নেই, আর যন্ত্রের পেছনে বসে থাকা মানুষগুলোরও যেন সহানুভূতির বড় অভাব দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল সেবার নামে আমরা সমাজে এক অদ্ভুত এবং কঠোর যান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের জন্ম দিয়েছি। আগে কোনো ফাইলে ভুল থাকলে তা হয়তো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা যেত। কিন্তু এখন সিস্টেম যখন কোনো তথ্য ‘ম্যাচ’ করতে ব্যর্থ হয়ে লাল কালিতে ‘রিজেক্টেড’ বার্তা দেখায়, তখন ওই সিস্টেমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন। সেই ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া এতটাই জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচে ভরা যে, ভুক্তভোগী নাগরিককে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে, এক সার্ভার থেকে আরেক সার্ভারে দিকভ্রান্তের মতো ঘুরতে হয়। মাসের পর মাস ঘুরে, জুতার শুকতলা খইয়েও অনেক সময় একটি সামান্য ভুল সংশোধন করা সম্ভব হয় না। এই হয়রানি কেবল নাগরিকের সময় বা অর্থই নষ্ট করে না, বরং তার মানসিক শান্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে নাগরিক সেবার এই চিত্র কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
ডাটাবেজের এই অসামঞ্জস্যতা কেবল নাগরিক ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্যও এক অশনিসংকেত। যে সিস্টেমের তথ্যভাণ্ডার ত্রুটিপূর্ণ এবং যা হরহামেশাই সার্ভার ডাউন বা বিভ্রাটের শিকার হয়, তার সাইবার নিরাপত্তা কতটা মজবুত, তা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। একটি নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ হলো ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রথম শর্ত। যখন সরকারি ডাটাবেজগুলোতে তথ্যের গরমিল থাকে, তখন অসাধু চক্র খুব সহজেই সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জালিয়াতি করতে পারে। আমরা দেখেছি, ভুয়া জন্মনিবন্ধন বা ভুয়া এনআইডি তৈরি করে কীভাবে অপরাধীরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর তথ্য (যেমন—বায়োমেট্রিক ডেটা, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড) এই ডাটাবেজগুলোতে সংরক্ষিত থাকে। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার যদি কারিগরিভাবে ত্রুটিমুক্ত এবং শতভাগ সুরক্ষিত না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে তা হ্যাকারদের শিকারে পরিণত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মূল উদ্দেশ্য কেবল কোটি টাকা ব্যয়ে কিছু ওয়েবসাইট তৈরি করা, সার্ভার কেনা বা অ্যাপ উন্মুক্ত করা নয়; এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নাগরিকের জীবনকে সহজ, গতিশীল এবং হয়রানিমুক্ত করা। কিন্তু আমরা প্রায়শই লক্ষ্য করি, আমাদের প্রকল্পগুলোতে বাহ্যিক চাকচিক্য বা সিস্টেম ‘লঞ্চ’ করার দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়, তার দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, টেস্টিং (Quality Assurance) এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একটি সিস্টেম তৈরি করার পর তা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য কতটা উপযুক্ত, ট্রাফিক বাড়লে সার্ভার তা সামলাতে পারবে কি না, বা ডাটা ইনপুটের সময় ভুল কমানোর কী কী স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে—এই বিষয়গুলো নিয়ে দূরদর্শী চিন্তার অভাব প্রকট। এর ফলেই পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের দিন এডুকেশন বোর্ডের সার্ভার ক্র্যাশ করে, কিংবা টিকার নিবন্ধনের সময় পোর্টাল অচল হয়ে পড়ে। এই প্রযুক্তিগত দৈন্য থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
ডিজিটাল সেবাকে নির্ভরযোগ্য ও ত্রুটিমুক্ত করতে হলে একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর প্রয়োজন। প্রথমত, ডাটাবেজগুলো যারা তৈরি ও পরিচালনা করছেন, তাদের পেশাদারিত্ব ও কারিগরি দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। যেকোনো সরকারি সেবা উন্মুক্ত করার আগে তার কঠোর ‘লোড টেস্টিং’ এবং ‘সিকিউরিটি অডিট’ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ডাটাবেজের মধ্যে একটি নির্ভুল ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা আন্তঃসংযোগ থাকতে হবে, যাতে নাগরিককে বারবার একই তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে দিতে না হয় এবং এক জায়গার তথ্যের সাথে অন্য জায়গার তথ্যের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুল সংশোধনের জন্য একটি অত্যন্ত সহজ, দ্রুত এবং জনবান্ধব ‘গ্রিভ্যান্স রিড্রেসাল মেকানিজম’ বা অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সিস্টেমের ভুলের দায়ভার কোনোভাবেই নাগরিকের ঘাড়ে চাপানো যাবে না; বরং নাগরিক যেন ঘরে বসেই বা নিকটস্থ কোনো সেবাকেন্দ্র থেকে দ্রুততম সময়ে তার তথ্য সংশোধন করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
প্রযুক্তি মানুষের জন্য, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয় এই শাশ্বত সত্যটি আমাদের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের ‘স্মার্ট’ বা আধুনিক হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের যেকোনো সেবা নিতে গিয়ে সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি লাভ করেন। সরকারি ডাটাবেজগুলো হওয়া উচিত আস্থার এক মজবুত দুর্গ, হয়রানির কোনো গোলকধাঁধা নয়। যে কৃষক রোদে পুড়ে ফসল ফলান, যে শ্রমিক ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, প্রযুক্তির অযোগ্যতায় তাদের চোখের জল ঝরানো কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। তাই এখনই সময় আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোর ত্রুটিগুলো মেরামত করে তাকে একটি নির্ভরযোগ্য, ত্রুটিমুক্ত এবং মানবিক রূপ দেওয়ার।
শুধুমাত্র যন্ত্রের আধুনিকায়ন নয়, বরং সেই যন্ত্রের পেছনের মানুষগুলোর মানসিকতার আধুনিকায়ন এবং দায়িত্ববোধের জাগরণই পারে আমাদের ডিজিটাল গভর্ন্যান্সকে একটি সার্থক ও সফল রূপ দিতে। একটি নির্ভুল ডাটাবেজ কেবল কিছু বাইট বা মেগাবাইটের সমষ্টি নয়, এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থার সবচেয়ে বড় দলিল।
লেখক: প্রকৌশলী ও নিবন্ধকার


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









